আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের এত আধিপত্য কেন?
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের এত আধিপত্য কেন?
ধরুন মেজবা সাহেব বিদেশে বেড়াতে যাবেন,তিনি এখন যে
দেশে যাবেন সেই দেশের একটি হোটেলে রুম বুকিং দিবেন । বুকিং দেওয়ার সময় অবশ্য তাকে হোটেল
ভাড়া ডলারে পরিশোধ করতে হবে। কারন ডলারে মূল্য পরিশোধ করা সহজ এবং আর্ন্তজাতিকভাবে
গ্রহনযোগ্য। একইভাবে এক দেশ হতে অন্য দেশে পণ্য আমদানী এবং রপ্তানীর ক্ষেত্রে মার্কিন
ডলারে মূল্য পরিশোধ করতে হয়। বর্তমান বিশ্বের যাবতীয় বাণিজ্যের ৮০ শতাংশ লেন-দেন হয়
মার্কিন ডলারের মাধ্যমে। পৃথিবীর আদিকাল হতে ব্যবসায়ের যাবতীয় লেনদেন হতো স্বর্ণমুদ্রা
মাধ্যমে। ১৮৮০ সাল থেকে ১৯১৪ সাল হলো গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের স্বর্ণযুগ। এ ব্যবস্থায়
অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলো তাদের মুদ্রার মান নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ হিসেবে
প্রকাশ করে। স্বর্ণমান ব্যবস্থাটি হলো অনেকটা এমন-এখনকার টাকায় লেখা থাকে, চাহিবামাত্র
এর বাহককে অত পরিমান টাকা দিতে বাধ্য থাকিবে। মুদ্রা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ভিত্তি হলো
স্বর্ণমান। যে সব দেশ গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিল তারা তাদের দেশীয়
মুদ্রার মূল্য কী পরিমাণ স্বর্ণের সমান হবে তা আইন করে বেধে দিয়েছিল। যেমন: এক পাউন্ড,
এক ডলার, এক জার্মান মার্কের বিনিময়ে কতটুকু স্বর্ণ আদান প্রদান করা যাবে তা সে সব
দেশের আইনে নির্ধারণ করে দেওয়া হতো। এ ব্যবস্থায় বিভিন্ন দেশের মুদ্রার মানের বিনিময়
হার বা এক্সচেঞ্জ রেটের ওঠা নামার খুব একটা বেশি সুযোগ ছিল না। খাঁটি গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড
আমলে কাগুজে মুদ্রার বিপরীতে শতকরা ১০০ ভাগ স্বর্ণ রিজার্ভ রাখার বিধান রাখা হয়। মুদ্রা
ব্যবস্থায় এর পরের ধাপ হিসেবে বলা হয় গোল্ড বুলিয়ান স্ট্যান্ডার্ডকে। প্রায় এক হাজার
একশবছর আগে মাটির পাত্রে পুঁতে রাখা ৪২৫টি স্বর্ণমুদ্রার সন্ধান পেয়েছেন গবেষকগন। প্রত্নতাত্ত্বিক
খনন কাজের সময় ইসরায়েলের কেন্দ্রস্থলে প্রাক ইসলামি যুগের এসব মুদ্রার সন্ধান পাওয়া
যায়। আব্বাসীয় খিলাফতের সময়কার এসব মুদ্রার মালিক কে ছিলেন আর কেনই বা তিনি সেটি পরে
তুলে নেননি সেই রহস্যের মীমাংসা হয়নি (ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির তথ্যসূত্র)।
মুদ্রা প্রচলনের আগে লেনদেনের প্রয়োজনে
কেবল ছিল বিনিময় ব্যবস্থা। একে অপরের মধ্যে পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে এখনকার অর্থের কাজ
মেটানো হতো। কালক্রমে প্রয়োজন দেখা দিলো একটি মুদ্রা ব্যবস্থার। প্রথমে ধাতব পণ্যে
যেমন তামা লোহা রুপা মুদ্রা হিসেবে প্রচলন হয় এবং কালক্রমে জনপ্রিয়তাও পায়। খ্রিষ্টপূর্ব
ষষ্ঠ বা পঞ্চম অব্দে তুরস্কের এশিয়া মহাদেশীয় অংশের লিডিয় জাতি সর্বপ্রথম মুদ্রা তৈরি
করে। লিডিয়দের মুদ্রা তৈরির প্রায় কাছাকাছি সময়ে প্রাচীন ভারতে মুদ্রা তৈরি এবং প্রচলন
হয়। ধারণা করা হয় এখানে মুদ্রার প্রচলন হয় প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে। অবশ্য আনুমানিক
খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে সুমেরিয়রা বার্লি বিক্রির জন্য প্রথম ধাতব মুদ্রা ব্যবহার
করে। বিনিময় প্রথার জন্য ধাতব মুদ্রার পরে আসে কাগুজে মুদ্রা। চীন দেশে সর্বপ্রথম কাগুজে
মুদ্রার বা নোটের প্রচলন শুরু হয়, ট্যাঙের রাজত্বকালে (৬১৮-৯০৭ সাল)। পরবর্তীতে ধীরে
ধীরে প্রচলন শুরু হয় কাগুজে নোটের। ১৬৯০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস
বে কলোনিতে সর্বপ্রথম কাগজের নোটের প্রস্তাবনা করা হয়। ১৭৬০ সালে প্রথম ডলার ছাপানো
হয় এবং তা সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়। ২য় বিশ্ব যুদ্ধের পর আমেরিকা তার মিত্র দেশ সমূহের
কাছে যত সরঞ্জাম বিক্রী করেছে তার সবই পরিশোধ করতে হয়েছে স্বর্ণ মুদ্রা মাধ্যমে। এর
ফলে পৃথিবীর মুদ্রার ৭০% র্স্বণ চলে যায় আমেরিকার দখলে।
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্বের পর আমেরিকার বলয়ের
৪৪ টি দেশ একত্রি হয়ে একটি সম্মেলনের আয়োজন করে । ঐ সম্মেলনে ৪৪টি দেশ একটি ব্রেটন
উডস এ্যাগ্রিমেন্ট নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে সিদ্ধান্ত নেয় যে, দেশ সমূহের লেন-দেনের
ক্ষেত্রে তারা মার্কিন ডলার ব্যবহার করবে। ব্রেটোন উডস ব্যবস্থা তদারকির জন্য আন্তর্জাতিক
মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রতিষ্ঠা করা হয়। আমেরিকার ডলারের মূল্য নির্ধারিত হতো স্বর্ণ
মূদ্রার মাধ্যমে। মার্কিন ডলারের রির্জাভ পর্যাপ্ত ছিল এবং মুদ্রার মূল্যও স্থিতিশীল
ছিল। আমেরিকার স্বর্ণ রির্জাভ পর্যাপ্ত থাকায় ৪৪টি দেশ তাদের রির্জাভ মার্কিন হলারে
রাখতে সম্মত হয়। সেই থেকে মার্কিন ডলার আর্ন্তজাতিক মূদ্রা হিসেবে বিশ্বকে শাষন করা
শুরু করে। এর পর ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট সৌদিআরবের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে । চুক্তি
অনুযায়ী সৌদি সরকার যত তেল বিক্রী করবে তার বিনিময় হবে মার্কিন ডলারের মাধ্যমে। বিনিময়ে
মার্কিন যুক্তরাষ্ট সৌদি আরবকে বহিঃশত্রুর আক্রমন থেকে রক্ষার বিষয়টি দেখবে এবং নিরাপত্তা
দিবে। ফলে মার্কিন ডলার একটি অত্যাবশ্যকীয় মুদ্রা হয়ে উঠলো আর্ন্তজাতিক লেনদেন এর ক্ষেত্রে।
পাশাপশি অন্যান্য দেশ সমূহও ডলারের বিনিময়ে তেল বিক্রী শুরু করলো। তখন মার্কিনিরা ডলার
ছাপিয়ে দেদারছে তেল ক্রয় শুরু করলো। কিছু কিছু তেল রপ্তানীকারক দেশ বিষয়টি বুঝতে পেরে
ভিন্ন মুদ্রায়/ পন্থায় তেল বিক্রীর উদ্যোগ নিলে তাদের করুন পরিনতি বরন করতে হয়। এই
ভাবে ডলারে আধিপাত্যকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। তেলই যেহেতু আধুনিক যুগের হীরা এবং চালিকা
শক্তি তাই তেল ক্রয়ের জন্য ডলার ছাড়া আর কোনো উপায় থাকলো না কারোই।
আইএমএফ এর ২০১৯ সালের একটি হিসেব অনুযায়ী
বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমূহের ৬০ শতাংশ রির্জাভ রাখা হয় মার্কিন ডলারে। ডলারে ব্যবহারে
বাংলাদেশও বিশ্ব থেকে ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশ একটি আমদানি নির্ভর দেশ। সাথে সাথে আমরা
একটি আমদানী-রপ্তানী ব্যালেন্স ঘাটতির দেশ ও বটে। এবার আমরা জানতে চেষ্টা করবো বাংলাদেশ
কিভাবে ডলারের মূল্যমান নির্ধারন করে। সাধারনতঃ তিনটি তত্ত্ব মুদ্রার মান নির্ধারনে
কাজ করে। (১) ব্যালেন্স অফ পেমেন্ট তত্ত্ব (২) Purchasing power parity ( ক্রয় ক্ষমতার
সক্ষমতা) (৩) গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড তত্ত্ব। যখন কোনো দেশের আমদানীর পরিমান বেশী থাকে
সেই দেশের মুদ্রার মান ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। আবার কোনো দেশের যদি আমদানীর তুলনায়
রপ্তানীর পরিমান বেশী হয় তখন সেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রির্জাভ বৃদ্ধি পায় এবং ঐ দেশের
মুদ্রার মান নির্ধারনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ধরা যাক বাংলাদেশে দুই লিটার তেল এর মূল্য
২৩০ টাকা আর আমেরিকার ০২ (দুই) ডলার; অর্থ্যাৎ বাংলাদেশের ২৩০ টাকা = মার্কিন ২ ডলার
এবং প্রতি ডলারের মূল্য হবে ১১৫ টাকা। সাধারনত ব্যালেন্স আফ পেমেন্ট তত্ত্বের মাধ্যমে
মুদ্রার মান নির্ধারন করা হয় আর পিপিপি তত্ত্বের মাধ্যমে এর বিশুদ্ধতা যাচাই করা হয়ে
থাকে। মুদ্রার চাহিদা, গ্রহনযোগ্যতা এবং এর যোগানের উপর যে কোনো দেশের মুদ্রার মান
নির্ধারন হয়। এছাড়াও গোল্ড ষ্ট্যার্ন্ডাড প্রদ্ধতিতেও মুদ্রার মান ঠিক করা যায়। যেমন
বাংলাদেশে এক ভরি স্বর্ন জমা রেখে ১ লক্ষ টাকা ছাপাতে পারে।
চাহিদা ও যোগানের তারতম্য এবং দ্রব্যমূল্যের
পার্থক্যের কারণে জাপানি ইয়েন এবং দক্ষিণ কোরিয়ান ওনের চেয়ে বাংলাদেশী টাকার মূল্য
বেশি। তবে এক্ষত্রে একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, দুই দেশের মধ্যে একটি দেশের মুদ্রার
মান কম হবার অর্থ এই নয় যে, সেই দেশটির অর্থনীতি অপর দেশ হতে খারাপ। কারণ অর্থনীতির
কাঠামোর উপর নয় বরং আন্তর্জাতিক বাজারে মুদ্রার চাহিদা ও যোগান এবং দেশের দ্রব্য মূল্যের
উপর ভিত্তি করে মুদ্রার মান নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে কুয়েতি দিনারের মান বাংলাদেশী
টাকায় সবচেয়ে বেশি। আর এর পেছনেও রয়েছে একটি কারণ। সারাবিশ্বের পরিশোধিত তেল ডলারের
সাহায্যে ক্রয়-বিক্রয় করা হলেও কুয়েতি তেলের দাম কুয়েতি দিনারেই পরিশোধ করতে হয়। সাধারণত
পেট্রোলিয়াম জাতীয় তেলের চাহিদা পৃথিবীব্যাপী অনেক বেশি। তাই রপ্তানীকারক দেশের চাহিদা
ও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্ট হিসেবে কাজ করে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শক্তিশালী ডলার বিভিন্ন
উপায়ে বিশ্বজুড়ে সংকট তৈরি করছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রনে যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রীয় ব্যাংক
সুদহার বৃদ্ধি করছে অনেকটা বেপরোয়ভাবে। ফলে বিগত ২/১ বছর বেশ কয়েকবার সুদাহার বৃদ্ধির
কারনে ডলারের মূল্য এখন আকাশ ছোয়া। ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারনে দেশে দেশে পণ্য ও সেবার
মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক গুন। তার উপর আবার মরার উপর খড়ার গা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ
বিশ্ব খাদ্য ও জ্বালানী মূল্য অনেক গুন বাড়িয়ে দিয়েছে। দুই দশকে সর্বোচ্চ এবং আর্ন্তজাতিক অন্যান্য মুদ্রার
বিপরীতে হাল সময়ে মার্কিন ডলারের দাম বেড়েছে ২২ শতাংশ। ডলারের উচ্চ মূল্যের কারনে বিভিন্ন
দেশে ছড়িয়ে পড়ছে মূল্যস্ফীতি। প্রথমত, ডলারের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং
বিদ্যমান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত, ঋণ পরিশোধে অতিরিক্ত ব্যয়
করতে হয়। কারণ ঋণ পরিশোধ করার সময় ডলারে রূপান্তর করতে আগের তুলনায় বেশি স্থানীয় মুদ্রার
প্রয়োজন হয়। তৃতীয়ত, বিশ্বের দেশগুলো নিজেদের মুদ্রার মান ঠিক রাখতে সুদহার বৃদ্ধি
করে। কিন্তু এভাবে উচ্চ সুদহার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করে এবং বেকারত্ব হার
কে বাড়িয়ে থাকে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের আরিয়ান কার্টিস
বলেন, ‘সহজ করে বললে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য খারাপ খবর। আগামী বছর
গুলোতে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার মধ্যে পড়বে বলে যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি
এর অন্যতম প্রধান কারণ”। আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ গীতা গোপিনাথ বলেন‘‘যুক্তরাষ্ট্রের
ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার বৃদ্ধিতে শক্তিশালী হচ্ছে ডলার। এতে অন্য দেশগুলোও সুদহার
বাড়াচ্ছে। এভাবে বিশ্বজুড়ে সুদহার বৃদ্ধিতে অনেক দেশের আর্থিক অবস্থা আরো কঠিন হচ্ছে
উদীয়মান ও নিম্ন আয়ের অনেক দেশ ঋণের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ডলারের ঊর্ধ্বগতি তাদের সেই
ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ অবস্থায় অনেক দেশেই মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করেছে। এ বছর
জাপানি মুদ্রা ইয়েনের বিপরীতে ডলারের দাম বেড়েছে ২২ শতাংশ, ইউরোর বিপরীতে বেড়েছে ১৩শতাংশ
এবং উদীয়মান বাজারের মুদ্রাগুলোর বিপরীতে বেড়েছে ৬ শতাংশ। ডলারের মূল্যবৃদ্ধিতে এশিয়ার
মুদ্রাবাজারে যেমন অস্থিরতা চলছে, তেমনি ইউরোপ এগিয়ে আসছে মন্দা। গত ২০ বছরে প্রথমবারের
মতো এক ইউরোর মূল্য এখন এক ডলারের থেকে কম। ডলার অনুপাতে ব্রিটিশ পাউন্ডের দামও একবছর
আগের তুলনায় ১৮ শতাংশ কমেছে। ডলারের বিপরীতে এ বছর বাংলাদেশি টাকার মান হ্রাস পেয়েছে
২৫ শতাংশ, শ্রীলঙ্কান রুপির দাম পড়েছে ৭৯ শতাংশ, পাকিস্তানি রুপির দাম পড়েছে প্রায়
২৮ শতাংশ এবং ভারতীয় রুপির দাম পড়েছে ১০ শতাংশ। কোনো দেশের মুদ্রার বিনিময় হার কমালে
তাকে অবমূল্যায়ন আবার মুদ্রার বিনিময় হার বাড়ানো হলে তাকে পুন মূল্যায়ন বা উর্ধ্ব মূল্যায়ন
বলা হয়। বিশ্বে মূলতঃ ভারসাম্য বিনিময় হার মানা হয়।
অন্যদিকে জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশের বিনিময়
ব্যবস্থাপনাসহ সামগ্রিক অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। প্রথমত ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে
৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর মোটামুটি শূন্য ফরেন এক্সচেঞ্জ তহবিল নিয়ে বাংলাদেশকে
যাত্রা শুরু করতে হয়েছে । ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি
তেলের সংকটের আঁচ গিয়ে পড়ে মুদ্রা ব্যবস্থায়। বিশ্বব্যাপী ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি দেখা
যায় তখন। শিল্প ও কৃষি উৎপাদনই কমে একটি অসহনীয়
অবস্থার সৃষ্টি হয়। সেই সঙ্গে ১৯৭৪ সালের বন্যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সংকটময় মুহূর্ত
তৈরি করে। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে প্রবাসীদের অর্জিত অর্থে সরাসরি আমদানি সুবিধা প্রদানের
জন্য ওয়েজ আর্নার্স স্কিম ব্যবস্থা চালু করা হয়। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ১৯৭৫ সালে
বাংলাদেশ টাকার বেসরকারি হার দাঁড়ায় প্রতি পাউন্ড প্রায় ৬০ টাকা। ওই বছরের ১৫ মে বাংলাদেশ
টাকা প্রথমবারের মতো প্রায় ৫৮ শতাংশ অবমূল্যায়ন করে নতুন বিনিময় হার করা হয় প্রতি পাউন্ড
৩০ টাকা। পরবর্তীতে অবশ্য বড় মাপের পরিবর্তে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাত্রায় অবমূল্যায়নের
পথ বেছে নেওয়া হয়। অসংখ্যবার অবমূল্যায়নের ফলে ২০০৫ সাল নাগাদ মার্কিন ডলারের সঙ্গে
টাকার বিনিময় হার দাঁড়ায় ৬০ টাকা। বাংলাদেশে ডলার ও টাকার বিনিময় হার স্বাধীনতার পর
থেকে সরকার নির্ধারণ করে দিত। ০০৩ সালে এই বিনিময় হারকে করা হয় ফ্লোটিং বা ভাসমান।
এরপর থেকে আর ঘোষণা দিয়ে টাকার অবমূল্যায়ন বা পুনর্মূল্যায়ন করা হয় না। তবে বিনিময়
হার ভাসমান হলেও পুরোপুরি তা বাজারভিত্তিক থাকেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব সময়ই এতে পরোক্ষ
নিয়ন্ত্রণ রেখে আসছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে অনুসরণ করে আসছে ‘ম্যানেজড
ফ্লোটিং রেট নীতি। ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১ মার্কিন ডলারের (ইউএসডি)
বিপরীতে টাকার দর ১০৮ দশমিক ৫৩ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
শুধু যে ডলারই আর্ন্তজাতিক
মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা নয়; যুগে যুগে বিভিন্ন দেশের মুদ্রা আর্ন্তজাতিক
লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত ছিল। যেমন পর্তুগাল, স্পেন, ফ্রান্স, ব্রিটেন এর পর
বর্তমানে মার্কিন মূদ্রা বিশ্ব দখল করে নিয়েছে। তবে বিগত কয়েক বছরে বিভিন্ন দেশের উদ্যোগে
ডি-ডলারাইজেশন চালুর ব্যাপক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। যেমন চীন ও রাশিয়া চাচ্ছে ডলারের
বিকল্প ভিন্ন মুদ্রা চালু হোক। চীন ও সৌদি আরবের মধ্যেও লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ভিন্ন
মুদ্রা চালুর আলোচনা চলছে। বাংলাদেশ রাশিয়া,চীন , ভারতের সাথে নিজস্ব মুদ্রায় আর্ন্তজাতিক
বাণিজ্য চালু করার বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে আইএমএফ চীনের
উয়ান কে ফরেন কারেন্সী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। যদিও উয়ান, রুবেল, ইউরো মুদ্রা সমূহ
সরকার/ইউনিয়ান গুলো কর্তৃক হস্তক্ষেপ করা হয় । সেই তুলনায় মার্কিন ডলার স্থিতিশীল থাকায়
আর্ন্তজাতিকভাবে দেশসমূহের আস্থায় এখনো মার্কিন ডলার দৃঢ় ভিত গেঢ়ে আছে । তবে ব্রিকস
যদি অভিন্ন মুদ্রা চালু করতে পারে তবে সেটি হবে ডলারের উপরে একটি বড় আঘাত । পাশাপাশি
ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা অভিন্ন মুদ্রা চালু করার উদ্যোগ গ্রহন করেছে। ইত্যোমধ্যে স্বর্ণ
সমর্থিত ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে লেনদেন করতে যাচ্ছে রাশিয়া ও ইরান। এছাড়া ভারতীয় রুপিতে
দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য করতে রাজি হয়েছে রাশিয়া ও শ্রীলঙ্কা। এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে
চীন যদি আরএমবি ডলারের সঙ্গে সমপর্যায়ে নিয়ে যেতে চায়, তার জন্য শুধু চীন সরকার কিংবা
চীনা বেসরকারি খাতের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের কিংবা ঋণের মূল্য পরিশোধ তাদের মুদ্রায় সম্পন্ন
হওয়াই যথেষ্ট নয়। ব্রাজিলের একজন রফতানিকারক ভারতের আমদানিকারককে যে মূল্য পরিশোধ করবে
তা তাকে আরএমবিতে লেনদেন করতে আগ্রহী হতে হবে কিংবা মালয়েশিয়া থেকে যে প্রবাসী কর্মী
বাংলাদেশে টাকা পাঠান তা আরএমবিতে পাঠাতে প্রলুব্ধ করতে হবে। এ ধরনের প্যারাডাইম শিফটের
বিশেষ কোনো লক্ষণ আপাতত বিশ্ববাণিজ্যে দৃশ্যমান নয়। যদিও কিছু দেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের
ক্ষেত্রে নিজ নিজ মুদ্রা ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করছে।
Comments
Post a Comment