ব্রিকস সম্প্রসারণ ও বাংলাদেশের অবস্থান: আমার একটি বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি

  ব্রিকসে যোগদান বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ!

 

২০০১ সালে গোল্ডেনম্যান স্যাক্স তাদের এক গবেষনা প্রতিবেদনে গবেষক জিম 'নেইল বিশ্বের উদিয়মান শক্তি গুলোর বিষয়ে ধারনা দিতে গিয়ে প্রথম চারটি দেশের (ব্রাজিল,রাশিয়া,ইন্ডিয়া,চায়না)একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্লক গঠনের বিষয়ে উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে ২০১১ সালে সাউথ আফ্রিকা এই জোটে যোগদান করে। ব্রিকস বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পূর্বে যেনে নেওয়া যাক,গোল্ডেনম্যান স্যাসেক্স কি এবং তাদের কার্যক্রম কি। ১৮৬৯ সালে মার্কাস গোল্ডম্যান লোয়ার ম্যানহাটনে প্রতিশ্রুতি নোট কেনা এবং বিক্রি করার একটি ছোট ব্যবসা শুরু করেন। একজন সৎ বোকার হিসাবে তার দৃঢ় সম্পর্ক এবং খ্যাতি তাকে এমন একটি কোম্পানির ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল যা তাকে পরবর্তীতে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করে। সময়ের সাথে সাথে, অধ্যবসায়,নির্ভুলতার জন্য মার্কাসের খ্যাতি তার ব্যবসাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে সাহায্য করেছে। ১৮৯০ সাল নাগাদ তার কোম্পানি র্টানওভার ছিল ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (২০১৯ ডলারে $৬৭৭ মিলিয়ন) মার্কাস ১৯০৪ সাল পর্যন্ত সিনিয়র পার্টনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি মারা যাওয়ার পর তার স্থলাভিষিক্ত হন তার জামাতা স্যামুয়েল শ্যাকস এবং তার পুত্র হেনরি।

  Goldman Sachs হল একটি শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান যা বিভিন্ন সরকার,ব্যক্তি অঞ্চল এবং বড় কর্পোরেশনগুলিতে বিনিয়োগ, ব্যাংকিং, সিকিউরিটিজ এবং বাণিজ্যিক গবেষনা এবং বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা আর্থিক পরিষেবা প্রদান করে। এটির সদর দফতর নিউইয়র্কে এবং সংস্থাটি নিজস্ব ভবনে সারা বিশ্বের প্রধান আর্থিক সংস্থা সমূহের অফিস পরিচালনা করে। বিশ্ব বাণিজ্যের কর্ণধার অর্থনীতিবিদদের চোখে প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা আকাশছোঁয়া। তাই এই প্রতিষ্টানের গবেষনায় যখন ব্রিকস বিষয়ে একটি ধারনা দেওয়া হয় তখন তা বিশ্বের কাছে গুরুত্বপূর্ন হবে এটাই স্বাভাবিক। সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদনে ব্রিকসের একটি শক্তিশালী অর্তনীতিক ব্লক গঠনের সম্ভবনা রয়েছে মর্মে উল্লেখ করা হয় (সূত্রঃ দি ইন্ডিয়ান টাইমস) ২০১৩ সালের হিসেব অনুযায়ী ব্রিকস জোটে পৃথিবীর মোট জিডিপির ২৭% আর গোটা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৪২ শতাংশ বসবাস করে এই ব্লকে। অর্থনীতিবিদ গবেষক জিম 'নেইল তাঁর গবেষনায় উল্লেখ করেন জি- এর তুলনায় ব্রিকস এর অর্থনৈতিক সম্ভবনা অনেক বেশী। বিষয়টি নিয়ে ২০০৬ সালে জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশন চলাকালে সাইটলাইনে চারটি দেশের পররাষ্ট মন্ত্রীদের একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

২০০৯ সালের জুন মাসে রাশিয়ার ইয়েকাটেরিনর্বাগ শহরে প্রথম রাষ্ট/সরকার প্রধানদের সম্মেলনের মাধ্যমে ব্রিকস প্রাতিষ্ঠানিক শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছায়। ১৫ই এপ্রিল ২০১০ সালে ব্রাসিলিয়ায় অনুষ্ঠিত ২য় শীর্ষ সম্মেলনে এর প্রাতিষ্ঠানিক গতি সঞ্চারিত হয়। ১৪ই এপ্রিল ২০১১ চীনে ৩য় শীর্ষ সম্মেলনে অর্তনীতি, কৃষি, জ্বালানী বিজ্ঞান এবং উন্নয়নের কৌশলগত খাতগুলো সনাক্ত এবং যৌথ প্রক্রিয়ায় কাজ করার উদ্যোগ গ্রহণের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। ২০২২ সালে নয়াদিল্লীতে চুর্তথ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৩ সালের আগষ্ট মাসে আফ্রিকায় ৫ম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। যেখানে বাংলাদেশ,সৌদি আরব সহ আরো কয়েকটি দেশের অংশগ্রহনের জন্য আমন্ত্রন জানানো হয়েছে। তবে ব্রিকস এর অন্যতম সদস্য রাশিয়া প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় সম্মেলনে তাঁর অংশগ্রহন অনিশ্চিত। 

২০১৪ সালে ব্রিকস কর্তৃক আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের খবরদারির বিপরীতে একটি বিকল্প নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) নামিয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় (গলফ নিউজ) ব্রিকস গঠনের মূল উদ্দেশ্যই হলো মার্কিন ডলারের আধিপত্য বিস্তার কমিয়ে আনা এবং আশিয়ান অঞ্চলে আন্তঃসীমান্ত বিনিয়োগ বাণিজ্য দেশী মুদ্রায় ব্যবহার বৃদ্ধি করা বলা হচ্ছে ব্রিকস মুদ্রা চালু হলে তা ডলারে বিপরীতে কতদিন টেকসই হবে তা দেখার বিষয় আছে। কেননা ইউরো পাউন্ড ,ষ্টালিং, জাপানি ইউন কিন্ত ডলারের সাথে পেরে উটতে পারেনি। কারন সদস্য দেশদেশগুলোর মধ্যে পারস্পারিক স্বার্থ,শ্রদ্ধা মেনে নেওয়ার মানষিকতা অত্যন্ত জরুরী,যা ব্রিকস দেশগুলোতে কতটুকু ধরে রাখতে পারবে তা সময়ে বলা যাবে।

ORF observer research foundation ব্যাখ্যায় বলা হয়প্রতি বছরই বিশেষজ্ঞ চিন্তাবিদরা এই শীর্ষ সম্মেলনের প্রেক্ষিতে বিশ্বের কার্যক্রমে একটি বহুপাক্ষিক মঞ্চ হিসেবে ব্রিকস-এর প্রাসঙ্গিকতার দিকটি নিয়ে আলোচনা করা হয়। যে সমস্ত ব্যক্তিব্রিকসআদৌ তাৎপর্যপূর্ণ কি না, নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তাঁরা এই বহুপাক্ষিক জোটের ব্যর্থতার জন্য তিনটি কারণ দেখিয়েছেন। প্রথমত, ব্রিকস দেশগুলির জাতীয়, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও অস্বাভাবিক ভাবে তাদের একত্র হওয়া। পাশাপাশি কথাও উঠে আসছে যে, ব্রিকস-এর অধিবেশন বাস্তবে বিনিয়োগকারীদের প্রলুব্ধ করতে গোল্ডম্যান স্যাকসের নেওয়া এক অত্যন্ত সফল বিপণন কৌশল ছিল, এটির লক্ষ্য কখনওই ভূরাজনৈতিক বা ভূ-অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ছিল না। দ্বিতীয়ত, চীন এই জোটে সঙ্গতিহীন বলে মনে করা। চীনের অর্থনীতির পরিসর এবং ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা মাথায় রাখলে তাকে এক প্রকার বহিরাগত বলা চলে। যে বহুমাত্রিকতার জন্য ব্রিকস-এর জন্ম হয়েছিল, তা আর নেই। বরং চীনের উত্থান এবং জি- বিশ্বনির্মাণের স্বপ্নের ছায়ায় তা ঢাকা পড়েছে অনেক আগেই। দেশের উত্তর সীমান্তে চীনা সৈন্যের অনুপ্রবেশ ভারতের কাছে এই বাস্তব পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। তৃতীয়ত, গত বছরগুলিতে ব্রিকস-এর শতাধিক আলোচনাসভার বাস্তবিক কোনও ফল মেলেনি। বিশেষত, ব্রেটন উডস পদ্ধতিআন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার (আই এম এফ), বিশ্ব ব্যাঙ্ক, এমনকি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউ টি ) সংস্কার প্রসঙ্গেও ব্রিকস-এর প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি এখনও। ব্রিকস পৃথিবীর একমাত্র বহুপাক্ষিক জোট যার নিজস্ব একটি ব্যাংক আছে কথা কর্মকর্তারা বার বার মনে করিয়ে দিলেও, তা ব্রিকস নিয়ে সমালোচকদের ধারণার পরিবর্তন করতে পারেনি।

বর্তমান সময়ে যত আলোচনা সমালোচনাই থাকুক না কেন সমসাময়িক আর্ন্তজাতিক ঘটনা প্রবাহ প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে ব্রিকস অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক কেনান ভু-রাজনৈতিক, ভূ-অর্থনীতি বিবেচনা করলে আর্ন্তজাতিক ব্যবসা বাণিজ্যে যে হারে মার্কিন ডলারের দৌরাত্ম তা বিশ্ববাণিজ্যের জন্য হুমকিস্বরুপ। ভবিষ্যতের হুমকি মোকাবিলা করে রাষ্টসমূহের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য বিকল্প চিন্তায় এগানোর প্রয়োজনিয়তা আছে। প্রত্যাশিত ভাবেই বিশ্ব বাণিজ্যর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে ভারত-চীন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে ব্রিকস সন্ত্রাসবাদ বিরোধী কর্মসূচি অনুমোদন করতে জাতীয় সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা ব্রিকস-এর শীর্ষ প্রতিনিধিরা সমবেত হয়েছিলেন। অধিবেশনে নেত্বিত দেন ভারতের জাতীয় সুরক্ষা উপদেষ্টা, সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র দফতরের দায়িত্বে থাকা পার্টির সর্বোচ্চ স্তরের সদস্য ইয়াং জেইচি, যিনি আলাস্কায় আমেরিকার সঙ্গে আলোচনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন রাশিয়ার জাতীয় সুরক্ষা পরিষদের সচিব জেনারেল নিকোলাই পাত্রুশেভ (সূত্রঃওআরএফ) যদিও ভবিষ্যৎ কর্মসূচির পরিকল্পনা এখনও প্রকাশ করা হয়নি, কিন্তু এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে ব্রিকস ধীরে ধীরে ভূ-রাজনৈতিক বিষয়গুলি নিয়ে আলাপ-আলোচনার একটি গুরুত্বপুর্ন মঞ্চ হয়ে উঠছে ইউক্রেনের প্রতি ন্যাটো শক্তিগুলির অব্যাহত সমর্থনের ফলে রাশিয়া কার্যত তার দোরগোড়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি পরাশক্তির মুখোমুখি হয়েছে। পরিণামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের প্রতিহত করার জন্য রাশিয়া দ্বিতীয় সর্বাধিক শক্তিসম্পন্ন বিশ্বশক্তি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের দিকে ঝুঁকে পড়তে থাকে। একই সঙ্গে রাশিয়া আফ্রিকার দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। রাশিয়ার শুধু আফ্রিকা মহাদেশের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি নেই, দেশটি মধ্য পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে ক্রমাগত বেশি করে বন্ধুত্ব করছে। কমনওয়েলথ অফ নেশনস এর ৫৪টি সদস্য রাষ্ট্র এবং অপরিমেয় অব্যবহৃত সম্পদসহ আফ্রিকা মহাদেশ রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান সম্প্রসারণবাদের জন্য যথেষ্ট সুযোগ করে দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়ার বৈদেশিক নীতি কৌশলে একদিকে চীন এবং অন্যদিকে আফ্রিকা মহাদেশের ক্রমবর্ধমান তাৎপর্য মূল্যায়ন করা কাজের হতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের প্রতিহত করার জন্য রাশিয়া দ্বিতীয় সর্বাধিক শক্তিসম্পন্ন বিশ্বশক্তি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের দিকে ঝোঁকার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সন্ধিক্ষণে রাশিয়া চীনের মধ্যে কৌশলগত স্বার্থের মিলন তাদেরকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন এবংবিধিভিত্তিকআন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য একটি ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদারির বন্ধন গড়ে তোলে। প্রেসিডেন্ট পুতিনের যদি লক্ষ্য হয় ইউক্রেন জয় করে রাশিয়ার গৌরব পুনরুজ্জীবিত করা, চীন আবার ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ানকে মূল ভূখণ্ডে পুনঃসংহত করতে আগ্রহী। উভয় দেশই বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে অসন্তুষ্ট, এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন স্থিতাবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছে। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে তাদের অনিবার্য পারস্পরিক নির্ভরতা প্রশংসনীয়ভাবে একটি নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার রূপরেখা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে চীন-আমেরিকার বৈরী সর্ম্পক বর্তমান বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাকে দুশ্চিন্তার মধ্যে পেলে দেয়। অন্যদিকে পারমাণবিক শক্তিধর দুই দেশ চীন-ভারতের দ্বন্দ্ব বিগত কয়েক বছর ধরেই বেশ প্রকট। সীমান্ত সংকটের পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা বয়কটের মতো পরিস্থিতিতেও পড়তে হয়েছে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ককে। দৃশ্যমান বিবাদ এবং সামরিক অচলাবস্থা সত্ত্বেও গত বছরে চীন-ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বেড়েছে অনেক। এর আগে যেখানে এক বছরে (২০২১ সালে) সর্বোচ্চ বাণিজ্যের লক্ষ্য ছিল ১০ হাজার কোটি ডলারের। সেই সীমা পেরিয়ে দুই দেশের বাণিজ্য দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৫৬৬ কোটি ডলারে। যদিও বছরেই ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে হাজার ৯০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে (সুত্রঃ উইওন নিউজ) তবে সীমান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যতই উত্তেজনা থাকুক, বাণিজ্যে যে শক্তিধর দুটি দেশই একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল তা স্পষ্টতই দৃশ্যমান। রাশিয়া,চীন,ভারত,আফ্রিকা দেশ সমূহ বর্তমান সময়ে আর্ন্তজাতিক বাণিজ্যে ওতোপ্রতোভাবে জডিয়ে আছে এবং একে অন্যের অনেক জন্য গুরুত্বপূর্ন।এই অঞ্চলের আরেকটি উদীমান রাষ্ট্র বাংলাদেশের ব্রিকসে যোগদানের বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যমত রয়েছে। যতদুর জানা যায়, ভারত রাশিয়া দুটি দেশই বাংলাদেশকে দ্বিপক্ষীয় মুদ্রায় বাণিজ্যও কারেন্সি সোয়াপের প্রস্তাব দিয়েছে। চীনেরও একই প্রস্তাবে সাড়া রয়েছে বলে জানা যায়। কিন্ত এই তিনটি দেশের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য সর্ম্পক জোড়ালো একমাত্র আমদানী নির্ভরতা দিয়ে।উল্লেখ্য, বাংলাদেশের রপ্তানী বাণিজ্যের ৮০ শতাংশ ইউরোপ-আমেরিকার উপর নির্ভরশীল। এখানের দেখার বিষয় হলো ডলার কে পাশ কাটিয়ে রুপি,ইউয়ান,রাশিয়ার রুবেল বাণিজ্য কার্যকর হলে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য ইউরোপ-আমেরিকা তাদের বাজার উম্মুক্ত রাখবে কিনা। মুক্ত বাজার এবং প্রাশ্চাত্য রপ্তানী নির্ভর দেশ হিসাবে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি মারাক্ত চ্যালেঞ্জ এবং ঝুঁকির কারন হয়ে দেখা দিতে পারে। এছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন,রাশিয়া,ভারত কিন্ত বার্মার পাশে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জটিল কঠিন সিদ্ধান্ত বিষয় হতে পারে বলে মনে হচ্ছে। যদিওবা চীন, ভারত, রাশিয়া বর্তমান সরকার কে দৃঢ়ভাবে সর্মথন করে আসছে। এখন দেখার বিষয় হলো বাণিজ্য ভু-রাজনীতিকে বাংলাদেশ কিভাবে সামাল দিতে সক্ষম হয়।

মূলতঃ পারস্পরিক আস্থা আর বিশ্বাস তৈরি করতে পারলে ব্রিকস ব্যাংক (নিউ ডেভেল্পমেন্ট ব্যাংক) একটি স্বতন্ত্র আর্ন্তজাতিক গ্রহণেযোগ্য মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করতে সক্ষম হতে পারে। সেক্ষেত্রে, দীর্ঘদিন থেকে মার্কিন ডলার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে একটি স্বীকৃত মুদ্রা হিসাবে বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত হলেও কালক্রমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃক বিভিন্ন দেশের আমেরিকান ফেডারেল রির্জাভ ব্যাংকে রক্ষিত বৈদেশিক মুদ্রার রির্জাভ বাজেয়াপ্ত করা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে/অর্থনৈতিক অবরোধ প্রয়োগ করার ফলে বিশ্বব্যাপী দেশসমূহে বিশ্বাসের ছিঁড় ধরেছে বলে ধারণাযোগ্য। এর ফলে আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলে বাণিজ্যে নতুন মুদ্রা ব্যবস্থার/পদ্ধতি চালুর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশ নতুন মুদ্রা ব্যবস্থায় যুক্ত হলে আগামীতে আমাদের জন্য কি কি সমস্যা এবং সম্ভবনা তৈরি হতে পারে তা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। 

প্রথমে আমরা এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অগ্রগতিতে কি কি প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হওয়া লাগতে পারে এমন কিছু খাত নিয়ে আলোচনা করবো। যেমন; () তৈরি পোষাক রপ্তানী খাতঃ ডলার পাশ কাটিয়ে আমরা যদি ভিন্ন ভিন্ন কারেন্সি সোয়াপের মাধ্যমে অথবা বিকল্প মুদ্রায় বৈদেশিক লেনদেন শুরু করি তাহলে আমাদের পোষাক রপ্তানী বাজারে প্রায় ৭৫% নির্ভরশীল ইউরোপ-আমেরিকা হতে বৈরী প্রভাব বিরাজ করবে। হঠাৎ করে পোষাক রপ্তানী বাণিজ্যের যেখানে ৭৫ শতাংশের দিক থেকে ঝড় আসবে স্বল্প সময়ে মোকাবিলা করা অনেক কঠিন হতে পারে। সাথে সাথে গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে চাপ থাকবে।পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন বাজার সৃষ্টি করা অনেক জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। () রেমিটেন্সঃ বাংলাদেশের ২য় সর্বোচ্চ আয়ের খাত বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিটেন্স। বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের বেশী রেমিটেন্স আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে,এর পর পরই আমেরিকা। ব্রিকসের কারনে বা বাংলাদেশ বিকল্প মুদ্রা ব্যবস্থায় আসলে প্রাথমিকভাবে আমাদের এইখাতে আঘাত আসার সম্ভবনা কম বলেই ধরে নেওয়া যায়। এছাড়া আরব রাষ্ট্রগুলো এখন আমেরিকার বলয় হতে বের হওয়ার চেষ্টায় আছে। () বৈদেশিক মুদ্রার রির্জাভঃ যেহেতু বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রির্জাভের অধিকাংশই মার্কিন ডলারে সেক্ষেত্রে মার্কিন প্রশাসন থেকে প্রতিকূল উপদেশ আসতেই পারে। সংকট ঘনীভূত হলে করনীয় কি হবে তার টেকসই পরিকল্পনা  এখনই প্রণয়ন করে রাখতে হবে। যা তাৎক্ষণিক সংকট সমাধানে কার্যকরী হবে। 

() বৈদেশিক বিনিয়োগঃ ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের বৈদেশিক মোট বিনিয়োগের (https://www.investmentmap.org/investment/indicators-by-country) ২১.৮৭% চীন (বিনিয়োগ প্রস্তাবনা সহ) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ .৮৭% অবশ্য পরবর্তী কয়েক বছরে বাংলাদেশে আমেরিকার বিনিয়োগ বাড়লেও সে তুলনায় সাম্প্রতিককালে আবার বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ ক্রমানয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেশি বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারী নিয়ে আসা সহজ পথ। দেশি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বিদেশি উদ্যোক্তাদের একটি সেতুবন্ধ গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সমস্যা হওয়ার সম্ভবনা কম থাকবে।

 

() রোহিঙ্গা সংকটঃ সাবেক নির্বাচন কমিশনার, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং এসআইপিজির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো (এনএসইউ) . এম সাখাওয়াত হোসেন বলেনরোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে, যার আলামত দৃশ্যমান। ফলে বাংলাদেশ সরকারের সামনে কূটনীতি ছাড়া আর যে পথগুলো খোলা রয়েছে, সেগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে।এখানে রাশিয়া,চীন,ভারত নিজ নিজ স্বার্থে রোহিঙ্গা সমস্যা ইস্যুতে বার্মাকে সর্মথন করছে অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই একটা ইস্যুতে বাংলাদেশকে সর্মথন করে। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক জোট আসিয়ানের সদস্য বার্মা। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সাথেও বার্মার ভালো সম্পর্ক রয়েছে মর্মে সংবাদ মাধ্যম গুলোর খবর প্রকাশ। ইদানিং রোহিঙ্গাদের নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের  আগ্রহ বরং ফিকে হয়ে আসছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আঞ্চলিক আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বাণিজ্যিক স্বার্থের কাছে ঘুরপাক খাচ্ছে রোহিঙ্গা সংকট (বিবিসি নিউজ) যুক্তরাষ্টের সর্মথন না পেলে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যার একটি টেকসই সমাধান করতে পারবে বলে মনে হয়না।

ভূ-রাজনীতি, ভূ-অর্থনীতি সবকিছু বিবেচনায় একটি ভারসাম্যমূলক কূটনীতি বজায় রেখে আমাদের বিভিন্ন জোট উপ-জোটে অন্তর্ভূক্ত হওয়ার কথা চিন্তা করতে হবে। তবে কথা মাথায় রাখতে হবে আগামী দিনের বিশ্ববাণিজ্যের নাটাই কার হাতে থাকবে। ডলারের বিকল্প মুদ্রা কি টেকসই আর্ন্তজাতিক বাণিজ্যে টিকে থাকতে পারবে? না আন্তঃদেশীয় কারেন্সী সোয়াপ অথবা একটি বিকল্প মুদ্রা দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংগঠিত হবে। তবে প্রথম দিক থেকে বাংলাদেশ যদি ব্রিকস ব্যাংকের সদস্য হতে পারে তবে এতে করে ব্রিকসে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ একটা অবস্থান থাকবে। এই কথা সত্য যে নতুন নতুন আর্ন্তজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান গঠিত হলে বিশ্বে অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উম্মেচিত হবে।


লেখাটি আপডেট করে পূনঃলিখন করা হয়েছ....

বাংলাদেশ ও ব্রিকস: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ভূমিকা

ব্রিকস (BRICS) — ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা — একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক জোট, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বিকল্প শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জোটটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি নতুন কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করছে, বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের মতো পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রিকস সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে সৌদি আরব, ইরান, মিসর, ইথিওপিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নতুন সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশও সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে আলোচনায় এসেছে। এই প্রবন্ধে বাংলাদেশের ব্রিকস সদস্যপদের সম্ভাবনা, অর্থনৈতিক সুযোগ, ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গত দুই দশকে চমৎকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। তৈরি পোশাক শিল্প, রেমিট্যান্স, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অবদান বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি স্থিতিশীল ভিত্তি প্রদান করেছে। তবে, বিগত বছরে বৈশ্বিক মন্দা, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, কোভিড-পরবর্তী সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে বিকল্প অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক জোটে অংশগ্রহণের প্রশ্নটি সামনে এসেছে।

ব্রিকস সদস্যপদের সম্ভাব্য সুফল

১. বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ: ব্রিকস উন্নয়ন ব্যাংকের (NDB) সদস্য হলে বাংলাদেশ পশ্চিমা অর্থায়নের বিকল্প উৎস পেতে পারে। বিশেষ করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে সহায়তা লাভ করা সম্ভব।

২. বাণিজ্যিক বহুমুখীকরণ: ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো যেতে পারে, যা তৈরি পোশাকের বাইরে অন্য খাতে বাজার সৃষ্টি করবে।

৩. ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা: ভারত ও চীনের মতো প্রতিবেশী এবং বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে একই প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে সুদৃঢ় করতে পারে।

সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ

১. চীনের প্রভাব ও ভারত-চীন দ্বন্দ্ব: ব্রিকসে চীনের কর্তৃত্ব অনেক বেশি। আবার, ভারত-চীন ভূরাজনৈতিক বিরোধ বাংলাদেশের জন্য ভারসাম্য রক্ষা কঠিন করে তুলতে পারে।

২. আন্তর্জাতিক চাপ: যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। ব্রিকসে যোগদানের ফলে পশ্চিমা বিশ্বে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে।

৩. অর্থনৈতিক প্রস্তুতি ও সংস্কার: ব্রিকসের মতো জোটে কার্যকর অংশগ্রহণের জন্য অর্থনৈতিক অবকাঠামো, বাণিজ্যিক উদারনীতি, এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা অপরিহার্য — যেখানে বাংলাদেশের কিছু ঘাটতি রয়েছে।

কূটনৈতিক কৌশল ও সুপারিশ

  • বাংলাদেশের উচিত ব্রিকস সদস্যপদের সম্ভাবনা নিয়ে একটি জাতীয় কৌশলগত মূল্যায়ন করা।

  • ভারত ও চীনের সঙ্গে সমান্তরালভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে ব্রিকসের ফোরামে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা।

  • বিকল্প অর্থায়নের সুযোগকে কাজে লাগাতে জাতীয় প্রকল্পসমূহে প্রস্তুতি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া।

বিশ্ব রাজনীতির পালাবদলে ব্রিকস এখন আর কেবল একটি আঞ্চলিক বা বিকল্প শক্তি নয়, বরং একটি উদীয়মান বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক মঞ্চ, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির কাঠামোতে নতুন ভারসাম্য সৃষ্টি করতে সক্ষম। বাংলাদেশের জন্য এই জোটে অন্তর্ভুক্তি শুধুমাত্র কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক অঙ্গনে উপস্থিতি বাড়ানো নয়, বরং এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য, উন্নয়ন তহবিলের বিকল্প উৎস, এবং বহুমুখী বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার এক সম্ভাবনাময় দ্বার উন্মোচিত হবে।

তবে, এই সুযোগের পাশাপাশি কিছু মৌলিক চ্যালেঞ্জ—বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানি নির্ভরতা, বৈদেশিক ঋণ ও রেমিট্যান্স ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা, এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা—সতর্ক দৃষ্টি ও সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক কৌশলের দাবি রাখে। অতএব, ব্রিকসে বাংলাদেশের সদস্যপদ অর্জনের পূর্বে একটি সমন্বিত মূল্যায়ন, নীতিনির্ধারকদের সুস্পষ্ট কৌশল, এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির দৃঢ় ভিত্তি অপরিহার্য।

বাংলাদেশ যদি এই সম্ভাবনাগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, এবং একইসঙ্গে ঝুঁকিগুলোকে বিচক্ষণতার সঙ্গে মোকাবেলা করে, তবে ভবিষ্যতের এক নতুন বহুপাক্ষিক বিশ্ব ব্যবস্থায় সে একটি সম্মানজনক ও কার্যকরী ভূমিকায় পৌঁছাতে পারবে—যা কেবল জাতীয় স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেবে না, বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্তরেও বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করে তুলবে।


সংক্ষিপ্তসারঃ

বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জসমূহ:

(১) তৈরি পোশাক খাত (RMG sector):

  • ডলার ব্যতীত লেনদেনের ক্ষেত্রে ক্রেতাদের গ্রহণযোগ্যতা

  • কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ডলার নির্ভরতা

  • ব্রিকস মুদ্রায় পেমেন্ট করলে বৈদেশিক ক্রয় ও বিক্রয়ের ভারসাম্য সমস্যা

(২) বৈদেশিক ঋণ ও রেমিট্যান্স:

  • বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের একটি বড় অংশ ডলারভিত্তিক

  • ব্রিকস মুদ্রায় রেমিট্যান্স আসার সম্ভাবনা কম, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ-আমেরিকা থেকে

(৩) আন্তর্জাতিক রেটিং ও বাজার প্রবেশাধিকার:

  • নতুন মুদ্রায় বাণিজ্য করলে বাংলাদেশ কি বর্তমান রেটিং ও বাজার সুবিধা পাবে?

  • ইউরোপ-আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা বা শুল্ক নীতির ঝুঁকি

(৪) রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা:

  • রোহিঙ্গা সংকটে ব্রিকস দেশের অবস্থান

  • আমেরিকা ও পশ্চিমা জোটের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে ভারসাম্যপূর্ণ রাখা যাবে?

সম্ভাব্য সুযোগ:

(১) ডলারের বিকল্প হিসাবে কারেন্সি ডাইভারসিফিকেশন

  • বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে স্থিতিশীলতা

  • আন্তর্জাতিক অবরোধের প্রভাব হ্রাস

(২) ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্সিং

  • নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB) হতে স্বল্প সুদে ঋণ

  • চীন, ভারত ও রাশিয়ার বিনিয়োগ প্রবাহ বৃদ্ধি

(৩) ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ব্যবহার করে মধ্যপন্থী কূটনীতি

  • বাংলাদেশকে একটি নিরপেক্ষ কৌশলগত অবস্থানে নিয়ে আসা

  • উভয় মেরুর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে লাভবান হওয়া ।







Comments

Popular posts from this blog

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যে নতুন মোড়: ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিলের প্রভাব বিশ্লেষণ ।

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা: ঐতিহ্যের শিকড়ে আধুনিক উত্তরণ ।