বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা,আর্ন্তজাতিক বাণিজ্য চুক্তি এবং বাংলাদেশের আর্ন্তজাতিক বাণিজ্যের সীমাবদ্ধতাঃ
লেখকঃ আরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া।
বর্তমান সময়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইউরোপের স্মরণাতীত কালের বাণিজ্য
নিষেধাজ্ঞা বিশ্ব অর্থনীতিকে ভয়াবহভাবে সংকটে
ফেলে দিয়েছে এই সংকট একদিকে দেশগুলোকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, অন্যদিকে সংকট থেকে উত্তরণের
নতুন নতুন পথের সন্ধান করে দিচ্ছে। মহামারীর সময় থেকে বর্তমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ
পর্যন্ত, বিশ্ব ক্রমাগত বিভিন্ন ভাবে খাদ্য,জ্বালানী, বাণিজ্য,নিরাপত্তা ইত্যাদির মতো
বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিশ্ব যখন করনা মহামারির প্রভাব পুনরুদ্ধার করতে
হিমশিম খাচ্ছে, তখন রুশ-ইউক্রেনীয় সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা মারাত্মক
হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। উন্নত, অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল সকল দেশ নানা ভাবে এই যুদ্ধের প্রভাবে সাঙ্ঘাতিকভাবে
ক্ষতির সম্মুখীন । সমস্যা গুলোকে মোকবেলায় রাষ্ট সমূহকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ভাবনা,পরিকল্পনা
নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। অনেক দেশের সংকট মোকাবেলায় বিভিন্ন গৃহিত পদক্ষেপ সমূহ কিছু কিছু
ক্ষেত্রে বিভিন্ন পক্ষ দ্বারা প্রতিরোধ/প্রতিবাদেরও সম্মুখীন হচ্ছে। এই প্রতিরোধ শুধু
অভ্যন্তরীণ নয়, প্রভাবশালী দেশের বিভিন্ন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার সমস্যাও রয়েছে। রাশিয়ার-ইউক্রেন
যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বে দেখা দিয়েছে খাদ্য,জ্বালানী,বৈদেশিক মুদ্রার (ডলার) সংকট। যুদ্ধ
আরাম্ভের সাথে সাথে আমেরিকা-ন্যাটো এবং আমেরিকার মিত্রদের রাশিয়ার উপর বিভিন্ন উপর্যুরি
বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা টালমাটাল করে দিয়েছে আর্ন্তজাতিক বাণিজ্যের গতি প্রকৃতি। নিষেধাজ্ঞার
কারনে রাশিয়ার সাথে বিভিন্ন রাষ্টের আমদানী-রপ্তানী ব্যাপক ভাবে বাধাগস্ত হয়েছে। লন্ডনভিত্তিক
ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ফেলো ম্যাক্সিমিলিয়ান
হেস বলেন,‘‘ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন ও এর পাল্টা হিসাবে রাশিয়ার ওপর আরোপ করা
নিষেধাজ্ঞার ফলে তেল-গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এতে পশ্চিমের দেশগুলো মূল্যস্ফীতির
মুখে পড়েছে। জার্মানি শীতের সময়ে গ্যাস রেশনিং ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে । রাশিয়া
বিশ্বের সবচেয়ে বড় খাদ্যশষ্য উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ। যুদ্ধের কারণে বিশ্বে সারের
সংকট দেখা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এতে শুধু বিশ্বের অর্থনৈতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে হুমকি
তৈরি হচ্ছে না, কৃষকদের জীবনযাত্রাও হুমকিতে পড়ছে।’’ রাশিয়া এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার
মুখোমুখি হওয়া একটি দেশ। মোট ৯ হাজার ১১৭টি নিষেধাজ্ঞার বোঝা বিশ্বের অন্যতম এই পরাশক্তির
কাঁধে (সুত্রঃwww.castellum.ai)। এর মধ্যে ৪ হাজার ৩৬২টি দেওয়া হয়েছে ইউক্রেনে হামলা শুরুর পরে। এর আগে নিষেধাজ্ঞা
পাওয়া দেশের তালিকায় শীর্ষে ছিল ইরান (৩৬১৬ টি)। এরপর রয়েছে সিরিয়া (২৬০৮ টি), উত্তর
কোরিয়া (২০৭৭ টি), ভেনেজুয়েলা (৬৫১ টি), মিয়ানমার (৫১০ টি) ও কিউবা (২০৮ টি)। যুক্তরাষ্ট্রের
কর্তৃক আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বন্ধু দেশগুলো মানতে বাধ্য নয়। কিন্তু কানাডা, যুক্তরাজ্য,
জার্মানি বা অস্ট্রেলিয়ার মতো যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে,
তারা ও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা অনুসরণ করে থাকে।
নিষেধাজ্ঞার মহামারিতে যখন বিশ্ব তখন দ্বীপাক্ষিক বাণিজ্য, আঞ্চলিক বাণিজ্য
গতি প্রকৃতি সময়ে সময়ে ভিন্ন রুপ নিচ্ছে প্রভাবশালী রাষ্ট্র বলয়ের রাজনৈতিক চাপের কারনে।
এতে গতিগ্রস্ত হচ্ছে আর্ন্তজাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য। বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারনে বিভিন্ন
দেশে নিজস্ব টাকার অবমূল্যায়নের কারনে বৃদ্ধি পাচ্ছে মূল্যস্ফীতি। আমদানী ব্যয় মিটাতে
হিমশিম খাচ্ছে বিভিন্ন রাষ্টগুলো। চাপ বাড়ছে বৈদেশিক রিজার্ভ এর উপর,ফলে ক্রমাগতভাবে
হ্রাস পাচ্ছে রাষ্ট্র সমুহের বৈদেশিক রির্জাভ। আয় কমে যাওয়ার ফলে আশংকাজনক হারে কমছে
বাংলাদেশের মত রাষ্ট সমুহের রেমিট্যান্স প্রবাহ। তবে বর্তমান এই মহা সংকটে বিভিন্ন
আঞ্চলিক ,উপ-আঞ্চলিক জোট, দ্বীপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি রাষ্ট্র গুলোর রক্ষাকবচ
হিসেবে কাজ করতে পারে। ভারত যেমনি ভাবে সুবিধা নিচ্ছে রাশিয়ার কাছ থেকে আবার ভারতের
জন্য নিষেধাজ্ঞা সংশোধন/প্রত্যাহার করছে আমেরিকা। সোভিয়েত আমল থেকে ভারত-সোভিয়েত (রাশিয়া)
সাথে দ্বীপাক্ষিক বাণিজ্যিক কৌশলগত সর্ম্পক বিদ্যমান। রাশিয়া ও ভারত উভয়ই এই সম্পর্কটিকে
একটি "বিশেষ ও অধিকারযুক্ত কৌশলগত অংশীদারিত্ব" হিসাবে অভিহিত করে। দ্বীপাক্ষিক
সম্পর্কের সুত্র ধরে রাশিয়া নিকট হতে জ্বালানী সংগ্রহে ব্যাপক হারে সুবিধা নিচ্ছে ভারত।
অন্যদিকে চীনকে পিছনে ফেলে আমেরিকা বর্তমান ভারতের প্রধান অংশীদার। এটিই হচ্ছে দ্বীপাক্ষিক
ও বহুপাক্ষিক আর্ন্তজাতিক বাণিজ্য চুক্তির সফলতা।
বাংলাদেশ এবং ভারতের মাঝে ও রয়েছে ৩টি বাণিজ্য চুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ন কৌশলগত
দ্বীপাক্ষিক সম্পর্ক। এছাড়াও সার্কভুক্ত দেশ হিসেবে আরো দুইটি বাণিজ্য আওতায় বাংলাদেশে-ভারত
দ্বীপাক্ষিয় বাণিজ্য সংগঠিত হয় । গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অসম বাণিজ্য
ও বিনিয়োগ সংগঠিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে আমদানির ক্ষেত্রে ভারত আমাদের একটা বড় উৎস ছিল। কিন্ত কালের
পরিক্রমায় চীন এখন বাংলাদেশের আমদানীর
প্রধান ও প্রথম অংশীদার। ভারত এখন বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আমদানিকারক দেশ। ভারত
থেকে আমরা যেসব পণ্য আমদানি করি গত কয়েক বছরে তার ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। চীন
এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। আগামী ০৮-১০ বছরের মধ্যে তারাই হবে এক নম্বরের
অর্থনীতি। আজকে তারা চারদিকেই বাণিজ্যিক বন্ধুর সন্ধান করছে। চীন তাদের অর্থনীতিতে
বিনা শুল্কে পণ্যের বাণিজ্যের জন্য অন্য দেশগুলোকে সুযোগ করে দিচ্ছে। বাংলাদেশের এই
সুযোগ নেওয়া অত্যান্ত জরুরী। আশা করা যায় বাংলাদেশ তার কৌশলগত অবস্থানকে অর্থনীতিতে
কাজে লাগাবে। বাংলাদেশ রপ্তানির ক্ষেত্রে RMG
নির্ভরশীল দেশ, অন্য পণ্যের উপযুক্ততা অর্জন করতে হলে অর্থনীতিতে
যে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ হওয়া দরকার, তা না হওয়ায় রপ্তানী পণ্যের বৈচিত্র্যকরণে আমরা পিছিয়ে
পড়ছি। তা হতে পারতো যদি আমরা কোনো বড় অর্থনৈতিক জোটের সদস্য হতে পারতাম। দক্ষিণ এশিয়ার
আঞ্চলিক জোট সার্কের আট সদস্যদেশের ছয়টিতে বাংলাদেশ যা রপ্তানি করে, এক ভারতেই বাংলাদেশ
রপ্তানি করে তার ছয় গুণ বেশি। আবার চীনের পর বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে
ভারত থেকে। এ রকম এক অবস্থায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়াতে সমন্বিত
অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) নামে নতুন এক চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করা হয়েছে।
মূলতঃ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের দিক
থেকেই এই চুক্তির প্রস্তাবটি করা হয়েছিল। এছাড়াও বন্ধুপ্রতীম মালেশিয়া,জাপান, নেপাল,ইন্দোনেশিয়া,ভিয়েতনাম,কুয়েত
সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার জোর চেষ্টা অব্যাহত আছে। ভুটানের সাথে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশ বহুপাক্ষিক/আন্ঞ্চলিক/দ্বী-পাক্ষিক
চুক্তির ক্ষেত্রে আলোচনা গুলোকে সফলতার পর্যায়ে নিয়ে যেতে এখনও দক্ষতার পরিচয় দেখাতে
পারেনি। যা আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো করতে পেরেছে। মালয়েশিয়ার ১৬টি, ভিয়েতনাম ও ভারতের
১৪টি করে এবং ফিলিপাইনের ৯টি এফটিএ সক্রিয় রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের মাত্র তিনটি
এফটিএ/পিটিএ সক্রিয় রয়েছে: এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বাণিজ্য চুক্তি (আপটা), উন্নয়নশীল
আট( ডি-৮) আর দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (সাফটা)। বাণিজ্যনীতি পুনর্বিন্যাসের
ক্ষেত্রে প্রধান ও সম্ভাবনাময় বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয়
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (বিএফটিএ) সম্পন্ন করার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ
এখন পর্যন্ত কোনো বিএফটিএ চুক্তি সম্পন্ন করতে পারেনি। কয়েক বছর ধরে মালয়েশিয়া, তুরস্ক,
ভুটান, নাইজেরিয়া, মেসিডোনিয়া, মিয়ানমার, মালি ও মরিশাসের সঙ্গে বিএফটিএ করা নিয়ে আলোচনা
চলমান রয়েছে। কিন্তু এসব দেশের বেশির ভাগের সঙ্গেই বাংলাদেশের বাণিজ্য খুব কম। একসময়
ভারত, তারপর চীনের সঙ্গে বিএফটিএ করার কথা জোরেশোরে উচ্চারিত হলেও এখন তা আলোর মুখ
দেখেনি।
আঞ্চলিক ভিত্তিতে বাংলাদেশের একাধিক আঞ্চলিক মুক্ত ও অগ্রাধিকারমূলক
বাণিজ্য চুক্তির সদস্য হলেও এ পর্যন্ত কোনো দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বানিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর
করেনি।ইরানের সাথে বাংলাদেশের একটি শুল্ক সুবিধা বিনিময় সংক্রান্ত
দ্বিপাক্ষিক অগ্রাধিকারমূলক চুক্তি (Preferential trade agreement) রয়েছে। কিন্ত প্রয়োজনীয় প্রটোকল চূড়ান্ত
না হওয়ায় সেটিও কার্যকর নয়। তবে এই পর্যন্ত ৪৫ টি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর
করেছে (সুত্রঃরপ্তানী অনু বিভাগ,বাণিজ্য মন্ত্রণালয়)। এসব চুক্তিগুলো মূলতঃ গুডউইল
ধরণের চুক্তি, যাতে বাণিজ্য সম্পসারনের সহযোগিতা বৃদ্ধি, তথ্য বিনিময়, অশুল্ক বাধা
দূরীকরনে প্রচেষ্টা গ্রহন, ব্যবসায়িক যোগাযোগ সম্পস্রারন ইত্যাদি। চুক্তিসমূহে শুল্ক
সুবিধা বিনিময়ের কোন বিধান রাথা হয়নি। বাংলাদেশ আশা করে World
Trade Organization (WTO) এর বহু জাতিক আলোচনার মাধ্যমে বিশ্ব
আরো মুক্ত বাণিজ্যের দিকে এগিয়ে যাবে, আর বাংলাদেশ সেই সুবিধা নিয়ে বাণিজ্যিক ভাবে
লাভবান হবে, আপাতত সেই সম্ভবনা অত্যান্ত ক্ষীণ। মুক্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে WTO-এখন খুব বেশী ভূমিকা রাখতে পারছেনা-
এ অবস্থায় বাংলাদেশকে নিজ উদ্যোগে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গঠনের
কাজ আরো তরান্বিত করতে হবে। ইতিমধ্যে ভিয়েতনাম এক ডজনেরও বেশি এফটিএ সই করেছে। সাধারনতঃবিনিয়োগ ওই সব অর্থনীতিতেই
গতি সঞ্চালন করে, যেগুলো অন্য এক বা একাধিক বড় অর্থনীতির সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যের অংশীদার।
মূল কথা হল বিনিয়োগ কখনোই বিচ্ছিন্ন অর্থনীতিতে প্রবাহিত হয় না।এ জন্য মুক্ত বাণিজ্য
চুক্তি বা এফটিএ, প্রেফারেন্সিয়াল ট্রেড অ্যগ্রিমেন্ট-পিটিএ এবং রিজোনাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট-আরটিএ
এর মতো পদক্ষেপগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার।
২০১০ সালে এফটিএ বিষয়ক মূল্যায়ন কমিটি ভারত, মালয়েশিয়া এবং নেপালের সঙ্গে পৃথক
এফটিএ করার সুপারিশ করা হয়েছিল। কমিটির সুপারিশ ছিল কোনো দেশের সঙ্গে এফটিএ করতে হলে
সে দেশের পণ্য ও সেবাভিত্তিক বাণিজ্যিক খাতের অগ্রাধিকার নির্ণয় করতে হবে। যার মূল
উদ্দেশ্য হবে বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত পণ্য রফতানির প্রবেশাধিকার বাড়িয়ে বাণিজ্য-ঘাটতি
কমিয়ে আনা। তবে দেরিতে হলেও স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের আগেই বিশ্ব বাণিজ্য
সংস্থার (ডব্লিউটিও) শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা হারানোর সম্ভাব্য ক্ষতি পুষিয়ে
নেয়ার উপায় নিয়ে সংশ্লিষ্টদের চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়ে গিয়েছে। এর লক্ষ্যে জোর দেয়া হচ্ছে
আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ওপর। গত ১০ মে, ২০২২ ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের
সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন,“যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত
সুবিধা নিশ্চিত করলে দুদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে এবং বাংলাদেশ সুবিধাজনক
সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে প্রস্তুত।” আজকের দিনে
বাস্তবতা হলো কোনো বড় অর্থনীতির সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সংযুক্ত না হয়ে
কোনো ছোট অর্থনীতি দেশের উন্নতিসাধন করা সম্ভব না। সে জন্যই আমাদের অঞ্চল ভিত্তিতে
হোক বা দ্বিপক্ষীয়ভাবে হোক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির দিকে যেতে হবে। ২০১০ সালে প্রণীত দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য
চুক্তি নীতিমালা অনুযায়ী কোনো দেশের সঙ্গে এফটিএ করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের
লাভ-ক্ষতি নিরূপণের লক্ষ্যে একটি ফিজিবিলিটি স্টাডি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আসলে মুক্ত
বাণিজ্য চুক্তি করতে গেলে বাণিজ্য অংশীদারদের যে ছাড় দিতে হয়, বাংলাদেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা
সেই বিষয়ে খুব বেশী আগ্রহী নন। বিষয়টি হলো, দেশ থেকে পণ্য রপ্তানি সুযোগ বিস্তৃত করা,
তেমনি ভাবে আমদানি ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সমূহ দুর করা। মুক্ত বাণিজ্যে সবার জন্য সমান
অধিকার রাখতে হয়। তা ছাড়া স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এত দিন যেসব বাজারসুবিধা
পেয়ে এসেছে, এই কাতার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আর তা একইভাবে অব্যাহত থাকবে না। সংকটময়
এই পরিস্থিতি বানিজ্যিক সুবিধা পেতে হলে দ্বীপাক্ষিক চুক্তি/সর্ম্পক থাকা খুবই জরুরী।
সর্ম্পকন্নয়ন এর মাধ্যমে বানিজ্যিক সুবিধা নিয়ে সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব।
অন্যথায় বাণিজ্যিকভাবে চরম মুল্য দিতে হয়। আগামী দিনে বাংলাদেশের রপ্তানী পণ্যের সংখ্যা,
৫০ বিলিয়ন রপ্তানী বাণিজ্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রয়াসে আমাদের আর্ন্তজাতিক বাণিজ্যের নেগোসিয়েসন
দক্ষতা বাড়াতে হবে, আমদানী-রপ্তানীর প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। বাংলাদেশকে মনে রাখতে
হবে, আমরা যদি আমাদের কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন না করি, তাহলে অন্যরা এসে সে ক্ষেত্র
পরিবর্তন করে দেবে না। আমরা যতই পেছনের দিকে তাকাব, অন্যরা আমাদের পাশ কাটিয়ে যাবে।
গত অর্থ বৎসরে বাংলাদেশ যেখানে মাত্র ৫০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করছে, সেই জায়গায়
থাইল্যান্ড গত বছর (২০২১) রপ্তানী খাতে আয় করেছে ২৬৯.১০বিলিয়ন ডলার, আর ভারত রপ্তানি করেছে ৬৬০.৫০ বিলিয়ন ডলারের ও বেশী। এই
খানেই বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় তা অনুমেয়।
তবে অনেক ক্ষেত্রে আয়তনে ছোট এবং ঘনবসতিপূর্ণ হলেও বাংলাদেশ স্বাধীনতা-পরবর্তী
৫০ বছরে সীমিত সাধ্য নিয়ে বিশ্বের দরবারে গৌরবোজ্জ্বল ও ঈর্ষণীয় অবস্থান তৈরি করেছে।
কিছু প্রাকৃতিক সুবিধা আর উদ্যমী সাধারণ মানুষের অবদান নিয়ে কয়েকটি খাতে বাংলাদেশ আছে
বিশ্বের শীর্ষ দেশের তালিকায়। এমন অবস্থান তৈরি করতে বাংলাদেশ সরকারের নীতি-সিদ্ধান্ত
গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রেখেছে। উদ্যোক্তাদের চেষ্টায় শত বিপত্তির মুখেও ব্যবসা-বাণিজ্য
ও শিল্পকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন বেসরকারি খাতনির্ভর অর্থনীতি।
অনেক ক্ষেত্রে চীন ও ভারতের বৃহৎ দেশের পরই উচ্চারণ হয় বাংলাদেশের নাম। অর্জিত অবদান
ধরে রাখা ,অর্জনের পরিধি আরো বৃদ্ধি করা সহ ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশকে
এখনই প্রস্তুত হতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত অর্থবছরে তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় ৯০
বিলিয়ন ডলার সমপরিমান পণ্য/সেবা আমদানি হয়েছে। প্রকৃতই এ পরিমাণ পণ্য দেশে আমদানি হয়েছে
কি-না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ দেশের বিনিয়োগ,শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সুচক মোতাবেক
অর্থনীতির কোনো সূচকেই ইতিহাস সৃষ্টি করা এ আমদানির প্রতিফলন ঘটেনি বলে বিশেষজ্ঞগন
মনে করেন। আমদানির নামে দেশ থেকে মুল্যবান অর্থ পাচার হয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ সৃষ্টি
হয়েছে কিনা সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখা যেতে পারে। বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সক্ষমতা, ব্যবসায়িক
ব্যয় ও দক্ষতার দিক থেকে বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনামের মতো সক্ষমতা অর্জন করতে
পারেনি। সক্ষমতার দূর্বলতায় আমাদের দেশে ব্যবসার ব্যয় (কস্ট অব ডুইং বিজনেস) অনেক বেশি।
সঙ্গে এখন সরাসরি যুক্ত হচ্ছে মূল্যস্ফীতি, কাঁচামাল, জ্বালানি ও শ্রমের মজুরি বৃদ্ধির
বিষয়। কারণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। শ্রমের মজুরিও
বাড়াতে হবে। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের বিনিয়োগ সক্ষমতার অগ্রগতি বাধাগস্ত হচ্ছে। বৈদেশিক
বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ব্যয়, সময় ও জটিলতা অনেক বেশি। সব মিলিয়ে বর্তমান অবস্থায় বিনিয়োগ
ও বাণিজ্যের দিক দিয়ে প্রতিযোগী দেশগুলোর কাছাকাছি পৌঁছাতে আমাদের অনেক সময়ের প্রয়োজন
হবে। জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) আকারের তুলনায় দেশে বিনিয়োগের পরিমাণ তুলনামূলক কম। এটা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিতে সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে কিছু উদ্বোগ
গ্রহন করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় লাভজনক বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশকে যেন ব্যবসা-বাণিজ্যের
ক্রেন্দ্র বিন্দুতে পরিনিত করা যায়, সে জন্য আমাদের বাণিজ্যিক নীতি সহজীকরন, ব্যবসায়িক
ব্যয় হ্রাস,অশুল্ক প্রতিবন্ধতা দুরীকরন সহ দেশীয় ব্রান্ড ভ্যালু তৈরি করতে হবে।
লেখকঃ আরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া,
Comments
Post a Comment