বাংলাদেশের আর্ন্তজাতিক বাণ্যিজ্যের অতীত,বর্তমান এবং ভবিষ্যত সম্ভবনাঃ

 বাংলাদেশের আর্ন্তজাতিক বাণ্যিজ্যের অতীত,বর্তমান এবং ভবিষ্যত সম্ভবনাঃ

লেখকঃ আরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া



আদি কাল থেকে বাংলাদেশ ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বিদেশীর নিকট সুর্বণভূমি। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল ছিল। এই অঞ্চলটি বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার হতো । জাতীয় জাদুঘরের কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম তাঁর একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন,“ মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়ে।” এই সুযোগে বহিরাগত জাতি ভারতে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করে। প্রথমে গ্রিক, পরে শক-পার্থিয়ান ও শেষে কুষাণরা আসে। কুষাণরা ভারতবর্ষে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চল দখল করে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। ব্যবসায়িক লেনদেনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশেও কুষাণ মুদ্রার প্রচলন ঘটে। কুষাণ মুদ্রা ভারতীয় ব্যবসা বাণিজ্যের ইতিহাস বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।  প্রাচীন আমল থেকেই বাংলা অঞ্চল ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা ইতিহাস পর্যালোচনায় ধারনা পাওয়া যায়। বাংলাদেশের অসংখ্য নদী-নালা অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য উপযোগী সুবিধাজনক যোগাযোগ ব্যবস্থার পথ তৈরী করে দিয়েছিল। আর বঙ্গোপসাগরের সান্নিধ্য বাংলাকে দিয়েছিল সামুদ্রিক বাণিজ্যের সুযোগ। বাংলার তথা বাংলাদেশের প্রাচীন ব্যবসা-বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি সমগ্র উপমহাদেশের প্রাচীন বাণিজ্যের সামগ্রিক পটভূমিতে অনুধাবন করা প্রয়োজন। উপমহাদেশের মতো প্রাচীন বাংলার অর্থনৈতিক কৃষি অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। প্রাচীন বাংলার জটিল অর্থনৈতিক জীবনের লক্ষণগুলি (স্থায়ী কৃষিজীবী সমাজ, বহুবিধ কারিগরি শিল্পোৎপাদন এবং বাণিজ্য) প্রথম পরিস্ফুট হয় সম্ভবত খ্রি.পূ চার শতকে অর্থাৎ মৌর্য আমলে। লাঙ্গলভিত্তিক কৃষিকাজ, যা উদ্বৃত্ত ফলনের এক অপরিহার্য উপাদান, কারিগরি শিল্পে অগ্রগতি, সুপ্রতিষ্ঠিত বিনিময় ব্যবস্থা এবং নগরাশ্রয়ী অর্থনীতি এসকল গাঙ্গেয় উপত্যকায় খ্রি.পূ ছয় শতক থেকে লক্ষ্য করা যায়।

 তবে যে পণ্যের জন্য বাংলার বাণিজ্য সর্বত্র বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছে তা হলো বাংলার মসলিন বস্ত্র বা সূক্ষ সুতিবস্ত্র। বিশ্ববাণিজ্যে যা ব্যপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। পেরিপ্লাসের বর্ণনা, আরবি ও ফারসি বিবরণী, রোমান ও চৈনিক বিবরণী, মার্কোপোলোর ভ্রমণবৃত্তান্তসহ আরও বহু প্রাচীণ রচনাতে (বিশেষত চাণক্যের অর্থশাস্ত্রে) মসলিনের উৎপাদন ও গুণগতমান নিয়ে বহু লিখিত আছে। আর বাংলায় উৎপাদিত এই মসলিন বস্ত্র রোম, চীন, মালাবার, কাম্বে, পেগু, টেনাসেরিম, সুমাত্রা, সিংহল, মালাক্কা ইত্যাদি প্রদেশে রপ্তানি হতো। এছাড়াও সুপারিও পান পণ্যবাণিজ্যে বিশেষ স্থানাধিকার করেছিল। আট শতক ও নয় থেকে তেরো শতক পর্যন্ত লেখমালায় উপকূলীয় অঞ্চল থেকে উৎপাদিত নারকেল ও লবণ, মসলা বাণিজ্যে যে বিশেষ চাহিদা ছিল তার প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায়। বনজ সম্পদের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা থেকে প্রাপ্ত কামরুনী অগরু কাঠ সহ গন্ডারের খড়্গ ও অন্যান্য বনজ সম্পদ পশ্চিম এশিয়ার আরব দেশগুলোতে রপ্তানি করা হত।  আমদানি - রপ্তানির জন্য কি ধরনের বিনিময় মাধ্যম ব্যবহার করা হত সে বিষয়ে জানতে হলে আমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে সেই সময়ের বাণিজ্যিক লেনদেনের দিকে। প্রাচীন বাংলার লেনদেন বলতে প্রধানত ব্যবসায়ীক লেনদেনের কথাই বোঝানো হয়ে থাকে। প্রাচীন বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য যে কতটা উন্নত ছিল সেটা বাংলার বিভিন্ন সময়কালের মুদ্রা ও তার বিভিন্নতা দেখলেই বোঝা যায়। কালের বিবর্তনে ইউরোপীয় শিল্প-বিপ্লব,নৌ পথের পাশাপাশি আকাশ পথের গুরুত্ব, বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আবিস্কারের ফলে শিল্প উৎপাদনের ব্যাপক প্রসারের কারনে ধীরে ধীরে এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্ব খানিকটা ম্লান হতে থাকে। তাড়াছা মধ্যযুগে এই অঞ্ছলের ধনী শ্রেনীর ক্ষমতা এবং দেশ দখলে নেশা ব্যবসা-বাণিজ্যের অগ্রগতির ধারাকে ব্যাহত করে । ইউরোপীয় অঞ্চলের তুলনায় এই ভূখন্ডে শিল্প বিপ্লব ব্যাপক সাড়া ফেলতে না পারার ধরুন কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এই অঞ্চলে প্রদান উপজিবিকা হিসেবে প্রধান্য পায়।

  মুসলমান শাসনের সময় থেকেই বাংলার পাট ও রেশমের চাষ শুরু হয়। বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল উৎস ছিল কৃষি। কৃষি ফলনের প্রাচুর্য থাকলেও এ সময়ের চাষাবাদ পদ্ধতি ছিল অনুন্নত। আধুনিক সময়ের মতো পানি সেচ ব্যবস্থা সে যুগে ছিল না। কৃষককে অধিকাংশ সময়ই সেচের জন্য বৃষ্টির ওপর নির্ভর করতে হতো। কৃষিপ্রধান দেশ বলে বাংলার অধিবাসীর বৃহত্তর অংশ ছিল কৃষক। বাংলার মাটিতে কৃষিজাত দ্রব্যের প্রাচুর্য ছিল। ফলে উদ্বৃত্ত বিভিন্ন পণ্য বিদেশে রপ্তানি করা হতো। এ ব্যবসায়িক তৎপরতা কালক্রমে শিল্পের ৪ ক্ষেত্রেও প্রসারিত হয়। মুসলমান শাসনকালে বঙ্গে বস্ত্র শিল্প, চিনি শিল্প, নৌকা নির্মাণ কারখানা ইত্যাদি গড়ে উঠেছিল। বাংলায় চিনি ও গুড় তৈরি এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। মধ্যযুগে বাংলার রকমারি ক্ষুদ্র শিল্পের কথা জানা যায়। এ প্রসঙ্গে ধাতব শিল্পের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তখন লৌহ নির্মিত দ্রব্যাদির ব্যাপক প্রচলন ছিল। কর্মকারগণ বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি নির্মাণ করত। এছাড়া দু’ধারী তরবারি, ছুরি, কাঁচি, কোদাল ইত্যাদি নিত্যব্যবহার্য ধাতব দ্রব্য তৈরি হতো। কলকাতা ও কাশিম বাজারে এদেশের লোকেরা কামান তৈরি করত। কাগজ, গালিচা, ইস্পাত প্রভৃতি শিল্পের কথাও জানা যায়। বঙ্গের অন্যতম শিল্প হিসেবে লবণের কথাও জানা যায়। দেশে স্বর্ণকার সম্প্রদায় ছিল। বাঙালি কারিগররা স্বর্ণ, রৌপ্য, ব্রোঞ্জ, কাঠ, পাথর, গজদন্ত ইত্যাদির কাজ বিশেষ নিপুণতার সঙ্গে সম্পাদন করত। শঙ্খ শিল্পের জন্য ঢাকার প্রচুর সুখ্যাতি ছিল । ঢাকার শাঁখারীপট্টি আজও সেকথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলার কৃষি ও শিল্প পণ্যের প্রাচুর্য এবং বিদেশে এগুলোর ব্যাপক চাহিদার ফলে বিদেশের সঙ্গে বাংলার বাণিজ্যিক তৎপরতা মুসলমান শাসন আমলে অভূতপূর্ব প্রসার লাভ করেছিল। বাংলার রপ্তানি পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ছিল সুতি কাপড়, মসলিন, রেশমি বস্ত্র, চাল, চিনি, গুড়, আদা, লঙ্কা ইত্যাদি। কালক্রমে বাংলার ব্যবসা বাণিজ্যে একটু একটু করে চুর্তর্থ শিল্পবিপ্লবের হাওয়া লাগতে শুরু করে। ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে পাট শিল্পে অগ্রগতি এবং রপ্তানীতে প্রভূত সাফল্য পায় এই অঞ্চল । ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের ব্যবসা বাণিজ্যে দ্রুত প্রসার লাভ করে। বেসরকারী শিল্প প্রতিষ্ঠান গুলো সরকারী ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসা হয়। পরবর্তীতে ব্যক্তি মালিকানায় অনেক ব্যবসা বাণিজ্য প্রসার লাভ করে। আশির দশকে শহর ও গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রভূত উন্নতি হতে থাকে। এলজিইডি নামে প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হলে সড়ক বিভাগের পাশাপাশি এ বিভাগ গ্রামাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাট নির্মাণেও ব্যাপক ভূমিকা রাখে। ১৯৭৯ সালে বিদেশে রিয়াজ র্গামেন্টস কর্তৃক তৈরি পোশাক রফতানি শুরু হয়। তৈরি পোশাক শিল্পের উন্নয়ন ও প্রসারকল্পে আশির দশকের প্রথম দিকে সরকার দুটো নীতি প্রবর্তন করে। একটি ব্যাক টু ব্যাক এলসির বিপরীতে ব্যাংক থেকে ঋণ প্রদান এবং অন্যটি হলো রফতানির জন্য প্রস্তুতকৃত পোশাকের কাঁচামাল আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ স্থাপন ও শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ ডিউটি ড্র ব্যাক। এতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে বিপ্লব ঘটে। ক্রমে রফতানিতে তৈরি পোশাক শিল্পের অবদান ৮৫ শতাংশে পৌঁছে। পোশাক শিল্পে নারীদের কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ শ্রমিকদের বিদেশে কর্মসংস্থানের ফলে গ্রামে অর্থপ্রবাহ ও ভোগ-চাহিদা বৃদ্ধি পায়। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশের বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পে বিনিয়োগের ফলে তৈরি পোশাক, খাদ্য-পানীয়-তামাক, ইস্পাত, সিমেন্ট, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, ভোজ্যতেল, রাবার ও প্লাস্টিক পণ্য, ইলেকট্রনিকস, হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং দ্রব্যাদি, বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল প্রভৃতির উৎপাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো পাশাপাশি  রপ্তানী করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে। দেশে ২০১৯ সালে জিডিপিতে শিল্পের অবদান প্রায় ছিল ৩৫ শতাংশ। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পের প্রসারের ফলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক। শুধুমাত্র শিল্পে নয়, পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পর্যটন প্রভৃতি সেবা খাত এবং অবকাঠামো উন্নয়ন, হাউজিং, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, আইসিটি প্রভৃতি খাতের ব্যাপক বিস্তৃতি ও কর্মসংস্থান করা সম্ভব হয়েছে। সাধারণভাবে বাংলাদেশের বেশিরভাগ পণ্য আমদানি হয় এশিয়ানভূক্ত দেশগুলো থেকে।

চীনের পরই বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। বৃহৎ পোশাক শিল্প রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের এই উত্থানের পিছনে অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ উভয় কারণই কাজ করেছিল, ফলে এই শিল্পের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। এই শিল্পের উত্থান এমন একটি সময়ে ঘটে যখন স্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে যেমন কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচির ধাক্কার সম্মুখিন হয়েছিল, বিদেশী বিনিয়োগকারীগন সে সময়ে নতুন স্থান অনুসন্ধান করছিল যেখানে সস্তা শ্রম বিদ্যমান আছে, যাহা শিল্প বিশ্ব বাজারের জন্য পণ্য যোগান দিতে সক্ষম হবে,তখন সস্তা শ্রম সরবরাহে বাংলাদেশ ছিল উর্বর ক্ষেত্র। ১৯৭৪ সালে যখন পশ্চিমা বিশ্ব মাল্টি-ফাইবার চুক্তি (এমএফএ) অনুযায়ী প্রান্তস্থ দেশগুলো থেকে পণ্য আমদানি শুরু করে তখনও পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনোও রপ্তানিযোগ্য পোশাক শিল্পের অস্তিত্ব ছিল না। এই চুক্তি ব্যবস্তার ফলে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ানসহ অনেক গার্মেন্টস রপ্তানিকারক দেশে দ্রুত এই শিল্পে বিকাশ লাভ করে। এক পর্যায়ে তাদের উপর ধার্যকৃত কোটার কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশের উদ্যোক্তারা নতুন উৎপাদন ক্ষেত্র হতে পারে এমন দেশ খুঁজছিল, ১৯৭৭ সাল নাগাদ তারা যৌথ উদ্যোগ এবং কোটামুক্ত দেশের সুবিধা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশকে বাছাই করে। সেখান থেকেই বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু। খুব দ্রুতই পোশাক শিল্পের বিস্তৃতি দেশের বিদ্যমান শিল্পের ভূচিত্র বদলে দেয়, এমনকি ২০০৪ সালে এমএফএ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বাংলাদেশের পোশাক শিল্প কম খরচে উৎপাদনের মাধ্যমে ক্রমাগত বিস্তৃত হতে থাকে। পোশাক শিল্পের পর বাংলাদেশ যে শিল্পটি অত্যান্ত সম্ভবনাময় আর সেটি হলো ওষুধ শিল্প। বর্তমানে দেশের দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠান ৫ হাজার ব্র্যান্ডের ৮ হাজারেরও বেশি ওষুধ উৎপাদন করছে। এর মধ্যে বড় ১০টি কোম্পানি দেশের চাহিদার ৮০ শতাংশ মিটিয়ে যাচ্ছে। বড় ২০টি কোম্পানি বিবেচনায় নিলে মোট চাহিদার ৯০ শতাংশ সরবরাহ করছে এ কোম্পানিগুলো। আর ৪০টি কোম্পানি ১৮২টি ব্র্যান্ডের সহস্রাধিক রকমের ওষুধ রপ্তানি করছে। এর মধ্যে দেশের আরো ১০-১২টি কোম্পানি বিভিন্ন দেশে রপ্তানিতে নিবন্ধন পেয়েছে। সত্তরের দশকে যেখানে দেশের চাহিদার ৭০ শতাংশ ওষুধ আমদানি করতে হতো, সেখানে এখন নিজেদের ৯৮ শতাংশ চাহিদা মিটিয়ে ১৫১টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করে প্রতি বছর বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে বাংলাদেশ। বর্তমানে মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ ওষুধ আমদানি করতে হয়। এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে স্থিরভাবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি পণ্যের আসন ধরে রাখবে ওষুধ।

তৈরি পোশাকের পাশাপাশি পাট, চামড়া ও হোম টেক্সটাইলসহ আরো নানা ধরনের পণ্য রপ্তানি করে বিশ্ববাজারে ক্রমেই অবস্থান সুসংহত করছে বাংলাদেশ। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিসটিক্যাল রিভিউ ২০২১’ শীর্ষক সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিক পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৯তম এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয়। এ অঞ্চলে ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। তৃতীয় স্থানে রয়েছে পাকিস্তান। অন্যদিকে বিশ্বের ৩২তম পণ্য আমদানিকারক দেশ বাংলাদেশ। গত বছর পণ্য আমদানি হয় ৫২ বিলিয়ন ডলারের। আগের বছরের চেয়ে আমদানি কমে ১১ শতাংশ। বৈশ্বিক অংশীদারি ০.৪ শতাংশ। পণ্য আমদানিতে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম স্থানে রয়েছে ভারত, দ্বিতীয় বাংলাদেশ এবং তৃতীয় স্থানে পাকিস্তান ।

বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি হল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত অপরাপর রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ও আচরণের নীতিমালা। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বাংলাদেশ 'সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়', এই নীতি অনুসরণ করে বৈদেশিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। একটি অসাম্প্রদায়িকক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সবসময়ই বিংশ শতাব্দীর স্নায়ুযুদ্ধে প্রভাবশালী রাষ্ট্রসমূহের পক্ষাবলম্বন থেকে বিরত থেকেছে। একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হওয়ার কারণে অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর বাংলাদেশের সঙ্গে সুদৃঢ় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের তথ্য মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে এখন ১৯৮টি দেশের বাণিজ্য রয়েছে। এর মধ্যে ৭১টি দেশের সঙ্গে রয়েছে বাণিজ্য ঘাটতি। বিশাল এ ঘাটতি কমাতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এফটিএ এবং পিটিএ সইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশে একমাত্র ভুটানের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্ন দেশ (এলডিসি) থেকে বেরিয়ে গেলে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির দিকে এগাতে হবে  বলে মন্তব্য করেন অর্থনীতির বিশ্লেষকগণ। এই বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রারম্ভিক বা প্রথম চুক্তি হিসেবে লাভ-লোকসানের হিসাবের বাইরে দেশের ইতিহাসে এটি মাইলফলক। অন্যদিকে দ্বিপক্ষীয় এই মুক্তবাণিজ্য চুক্তিকে বেসরকারী সেক্টর কীভাবে গ্রহণ করে তাও একটি গুরুত্বপূণ্য বিষয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সবশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৩ লাখ ৫৬ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে ভুটানে। দেশটির বাজারে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য, ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স, আসবাব, তৈরি পোশাক পণ্য রপ্তানি করেন। অপরদিকে দেশটি থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয়েছে প্রায় চার কোটি ডলারের পণ্য, যার মধ্যে রয়েছে কমলা, দারুচিনি সবচেয়ে বেশি। এছাড়া বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ভুটান থেকে চুনাপাথর, পাথর, কয়লাসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করেন। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) ভারতে ২৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। বর্তমান বাজারদরে টাকার হিসাবে এই অর্থের পরিমাণ ২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। ভৌগলিক কারণেই ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে। বর্তমান সময় থেকে ক্রমবর্ধমান হারে ভারতে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানীর পরিমান বৃদ্ধি পেতে থাকবেই বলে মনে করছেন বিশেষঞ্জগন। প্রায় দেড়শ কোটি মানুষের এই বিপুল চাহিদা মেটাতে ভারতকে বাংলাদেশ থেকে পোশাক ক্রয় করতে হবে। ভারতে পোশাক তৈরি করতে যে ব্যয় হয়, বাংলাদেশ থেকে আমদানি করলে খরচ তার থেকে অনেকটাই কম পড়ে। এইজন্য  হিসাব-নিকাশ করেই তারা এখন বাংলাদেশ থেকে বেশি বেশি পোশাক ক্রয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে। রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতির ফারাক এখনও বেশ বড়। ২০২০-২১ অর্থবছরে ভারতে পণ্য রপ্তানির তথ্য পাওয়া গেলেও দেশটি থেকে কী পরিমাণ পণ্য আমদানি করা হয়েছে তার পুরো তথ্য এখনও প্রকাশ করেনি দুই দেশের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগ। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের আমদানি করা ৫০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য মধ্যে চীন থেকে এসেছে ১১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। অন্যদিকে একই বছর চীন সারাবিশ্ব থেকে ২৪০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করলেও বাংলাদেশ চীনে রপ্তানী করতে পেরেছে মাত্র ৬০০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। চীনে বাংলাদেশ বাজার সম্প্রসারনের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ কটনপণ্যের পাশাপাশি সম্প্রতি ম্যানমেইড ফাইবারের তৈরি পণ্যের দিকে নজর দিয়েছে। এই খাতে সক্ষমতা বাড়াতে পারলে তা চীনা বাজার ধরতে সহায়কই হবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চলতি সক্ষমতা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে চীনে রপ্তানি বহুগুণে বাড়াতে পারে বাংলাদেশ। এজন্য প্রয়োজন ব্যবসায়ীদের মনযোগ, চীনে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং, শুল্কমুক্ত সুবিধা কাজে লাগানো এবং টেস্টিং ল্যাবসহ দেশীয় শিল্পের গুণগত মানের উন্নয়ন। পিআরআই এর গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক রাজ্জাক বলেন, চীনের আমদানি বাজারের মাত্র ১ শতাংশ দখল নেওয়া গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িতে অতিরিক্ত ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার যোগ হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করা সম্ভব বলে মনে করেন এই গবেষক।

চীনের নেতৃত্বে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৫টি দেশ রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ’ (আরসিইপি) নামে এক নতুন আঞ্চলিক চুক্তির সদস্য । সদস্য রাষ্টগুলোর মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, চীন, জাপান, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সংস্থার (আসিয়ান) ১০ সদস্যব্রুনেই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাও পিডিআর, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম। এই দেশগুলো বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দখল করে আছে। কম্বোডিয়া, লাওস ও মিয়ানমারের মতো তিনটি স্বল্পোন্নত দেশ এই চুক্তির সদস্য। এর মধ্যে লাওস ও মিয়ানমার উভয়ই বাংলাদেশের সঙ্গে ২০১৮ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হয়ে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। দেশ সমুহ ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। নতুন এই বাণিজ্য চুক্তির অংশীদার হওয়ার মাধ্যমে স্বল্পোন্নত এই দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার পরও অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা ভোগ করবে,যে সুবিধাটি বাংলাদেশ গ্রহন করতে পারবে না। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ পরে বাড়তি তিন বছর, অর্থাৎ ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের প্রাপ্য সুবিধাগুলো ভোগ করতে পারবে। এর পর বাংলাদেশ আর এই সুবিধা প্রাপ্য হবেনা। সুতরাং এ ধরনের বহুপক্ষীয় চুক্তির বাইরে না ভিতরে থাকবে বাংলাদেশ তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের ভাবনার অবকাশ রয়েছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হচ্ছে ভিয়েতনামের বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা। অনেক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে তার অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যদিও ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ শুল্কমুক্তকোটামুক্ত প্রবেশাধিকারের সুযোগ পাচ্ছে, কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটলে বাংলাদেশের জন্য এই সুযোগ আর থাকবে না। অথচ ভিয়েতনাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। এর ফলে ভিয়েতনাম ইউরোপের বাজারে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাবে,যে জাগায় বাংলাদেশে প্রতিযোগিতা করতে হবে। ভিয়েতনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন টিপিপিরও সদস্য, যদিও চুক্তিটি আপাততঃ স্থগিত রয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) দোহা রাউন্ড বাণিজ্য আলোচনা এখনো অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে, যার কারনে ডব্লিউটিওর সদস্যদেশগুলো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তিতে আগ্রহী হচ্ছে। আরসিইপি এবং অন্যান্য আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তির কারণে বাংলাদেশের যে সমূহ ক্ষতি হওয়ার আশংঙ্কা রয়েছে, তা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিগুলোয় সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে অনেকটা হ্রাস করা যাবে বলে আশা করা যায়। বাংলাদেশ বিমসটেকসহ একাধিক মুক্ত বাণিজ্য সংস্থার সদস্য হিসেবে আঞ্চলিক বাণিজ্য সংহতকরণ থেকে সুবিধা পাওয়ার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা আব্যশকতা রয়েছে।

সম্ভাবনা এবং বিভিন্ন সমস্যা হতে নতুন দিগন্ত উম্মোচন করতে হলে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, নতুন নতুন রপ্তানী বাজার সম্প্রসারণ করতে হবে, দেশীয় ব্র্যান্ডিংকে কাজে লাগাতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে বিনিয়োগের সুন্দর পরিবেশ , পরিকল্পিত অবকাঠামো, আমলাতান্তিক জটিলতা হ্রাস করতে হবে। ‘সিটি ইনভেষ্টমেন্ট রিসার্চ এন্ড অ্যানালাইসিস বাংলাদেশকে বিশ্বের দ্রুত প্রবৃদ্ধির দিক থেকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় দেশগুলোর তালিকায় প্রথমদিকে স্থান দিয়েছে। এছাড়া আইএমএফ, দ্য ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল, জেপি মর্গনান চেজ, এবং মর্গান স্ট্যানলি বাংলাদেশকে অপার সম্ভবনাময় দেশগুলোর তালিকায় প্রথম সারিতে যুক্ত করেছেন। এটা বাংলাদেশের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত বড় সহায়ক ভুমিকা হিসেবে কাজ করবে। উদিয়মান অর্থনীতির দেশে সমূহে রপ্তানি প্রণোদনা একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়। বাংলাদেশ ব্যাংক রপ্তানি বাণিজ্য উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ২০২১-২০২২ অর্থবছরে সরকার ৩৮টি পণ্যে নগদ সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে । এর মধ্যে ৮টি পণ্যে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ সহায়তা দেওয়া হবে। বাকিগুলোতে দেওয়া হয় ১ থেকে ৯ শতাংশ হারে প্রণোদনা পাবে। দেশে রপ্তানি প্রণোদনা রপ্তানী বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ আর্ন্তজাতিক বাণিজ্যে প্রসারে ভুমিকা রাখে।

দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উৎস রপ্তানি বাণিজ্য। দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য রপ্তানি বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা যা রপ্তানী বাণিজ্যকে বাধাগস্ত করে। এ জন্য বাণিজ্যের কাংঙ্খিত মাত্রায় অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। রপ্তানির বাধাগুলো দূর করা সম্ভব হলে বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব। এ ছাড়া নতুন রপ্তানি খাতের সুযোগ সৃষ্টি এবং নতুন পণ্য রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক। বৈদেশিক বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য রপ্তানী পণ্যের মধ্যে বৈচিত্র্য আনা খুবই জরুরী । বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, করপোরেট ট্যাক্স যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা, ফ্রি-ট্রেড জোনে বিনিয়োগের মনোরোম পরিবেশ তৈরি করা, যোগাযোগ ব্যবস্থার সর্বাধুনিকায়ন, সরকারী নীতিমালা সহজীকরন ইত্যাদি বিষয়ে সময়পযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহন করা জরুরী। ব্যবসা-বাণিজ্যে অযুত সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে কান্ট্রি ব্রান্ডিং অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কান্ট্রি ব্রান্ডিং হলো দেশের মানুষ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, পর্যটন ব্যবস্থাপনা, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ ও বর্হিগমন বিষয়ক পজেটিভ সূচক তৈরিপূর্বক দেশের খ্যাতি, মর্যাদা কিংবা পরিচয়কে অন্য দেশের নিকট উপস্থাপন করা। বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগের সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের ইমেজকে পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া অত্যান্ত সহজ। যার জন্য প্রয়োজন এই খাতে বাজেট বরাদ্দ রাখা এবং তার সঠিক তত্ত্বাবধান করা । স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এবং বিভিন্ন দেশের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এফটিএ/পিটিএ সম্পাদনের নীতি গ্রহণ করেছে। এ সকল দেশের সাথে এফটিএ/পিটিএ সংক্রান্ত অগ্রগতি নিয়মিত মনিটরিং করা এবং এই বিষয়াদির বাস্তব অগ্রগতি দৃশ্যমান করা প্রয়োজন । দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একশটি ইকোনোমিক জোন এবং বর্তমানে অপারেশনে থাকা ০৮ টি ইপিজেডসহ নতুন আরো তিনটি ইপিজেড এবং স্থাপিত হাইটেক র্পাক সমূহ দেশের বিনয়োগ বৃদ্ধিসহ রপ্তানী প্রবৃদ্ধিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায় । বঙ্গোপসাগরের পাশে অবস্থিত বলে বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থানটিকে খুব আকর্ষণীয় হিসাবে বিবেচনা করা হয় । দীর্ঘদিন থেকে চট্টগ্রাম এবং মোংলা বন্দরের গুরুত্বপূর্ন অবদান দেশে ব্যবসা বাণিজ্যকে প্রসারিত করতে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। বাজার অর্থনীতির প্রসার এবং বিভিন্ন পণ্যের চলাচল দিনদিন বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষিতে দেশের বন্দরগুলোর উপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশটির তৃতীয় সমুদ্রবন্দর, পায়রা উদ্বোধন করেন। অর্থনৈতিকভাবে বন্দর উন্নয়ন হলো অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপকে উদ্দীপিত করা এবং উদীয়মান কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির প্রক্রিয়া। বর্তমান সময়ে গৃহিত বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম, সুদূর প্রসারি চিন্তা চেতনার প্রসূত নীতি ও গৃহিত পদক্ষেপ অদূর ভবিষ্যতে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগবান্ধ পরিবেশ তৈরিতে অভূতপূর্ব ভুমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

লেখকঃ আরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া

বি.কম(সম্মান),এম.কম(হিসাব বিজ্ঞান), মাস্টার অব ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস (ঢাঃবিঃ),এমবিএ (মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা),উচ্চতর কোর্স (আর্ন্তজাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য) ফেডারেশন ইউনিভার্সিটি অব অষ্টেলিয়া।



 

Comments

Popular posts from this blog

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যে নতুন মোড়: ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিলের প্রভাব বিশ্লেষণ ।

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা: ঐতিহ্যের শিকড়ে আধুনিক উত্তরণ ।

ব্রিকস সম্প্রসারণ ও বাংলাদেশের অবস্থান: আমার একটি বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি