মহামারীর কালীন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দুর্দশা এবং ভবিষ্যতে উত্তরণের উপায়:

 মহামারীতে দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দুর্দশা ও ভবিষ্যতের উত্তরণের পথঃ

লেখকঃ আরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া


দেশের অর্থনীতির উন্নতিতে পোষাক শিল্প, ভারী ও মাঝারী শিল্প ,রেমিটেন্স প্রবাহের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এবং সরকারী হিসেবে প্রায় ২ কোটি ৭৭ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান এর ক্ষেত্র তৈরিতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অবদান অনস্বীকার্য। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে উঠা এই ব্যবসা-বাণিজ্য যেমনি দেশের অর্থনীতিতে গতির সঞ্চার করে, তেমনি বেকার অদক্ষ জনশক্তির কাজের ক্ষেত্র তৈরি করে। এই সেক্টরটি একাধারে উদ্যোক্তা সৃষ্টি, বেকারত্ব হ্রাস, পণ্যের সহজ বিপণন ব্যবস্থা সৃষ্টি, সমাজের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে বৈষম্য দূরীকরণে অবদান রেখে আসছে অবধারিত ভাবে। ইতিহাসবিদগন মনে করেন প্রায় চার হাজার বছর ধরে বিশ্বে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের প্রচলন রয়েছে। স্বল্প পুঁজি, স্বল্প সংখ্যক শ্রমিক নিয়ে এই ব্যবসা গঠন করা যায় বলে দেশের আনাছে কানাছে সর্বত্র বিভিন্ন ধরণের ক্ষুদ্র ব্যবসা চালু রয়েছে। দেশের মোট জিডিপিতে প্রায় ২৫ শতাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অবদান রয়েছে। এনবিআর-এর সাবেক চেয়ারম্যান, মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া একটি সেমিনারে বলেন,‘২০০৭-২০০৮ সালে পৃথিবীতে যখন ব্যাপক অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছিল এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ অর্থনৈতিকভাবে বসে পড়ার উপক্রম হয়,এছাড়াও ইউরোপের বেশ কয়েকটি বড় বড় দেশ অর্থনৈতিক ভাবে দূর্বল হয়ে যায় । সেইসব তুলনায় বাংলাদেশকে সে মন্দায় ধরতে পারেনি, তার অন্যমত কারণ আমাদের দেশের ক্ষুদ্রশিল্প এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা খাত এতে ক্ষেত্রে গতি সঞ্চার করেছিল।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পই দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির চালিকা শক্তি বলা চলে। সামান্য পুঁজি অধিক কর্মসংস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে এই  ব্যবসায়িক-বাণিজ্যিক খাত। বাংলাদেশের মতো বিপুল পরিমান বেকার শ্রমশক্তির দেশে বেকারত্ব হ্রাস ও দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। দেশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশ এবং মোট শ্রমবাজারের ২৫ শতাংশের কর্মসংস্থান হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকারখানা সমূহে । ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্বল্প পুঁজি, লাভ- লোকসানের হিসাব সীমিত, দেশে এমন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সংখ্যা ৭৭ লাখের বেশি। অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প মোট দেশজ উৎপাদনে আরও অনেক বেশি অবদান রাখতে পারবে। তবে প্রায় দুই বছর ধরে চলমান করোনা মহামারীতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ক্ষতির সম্মুখীন এই সেক্টরটি। কোভিড-১৯ এর কারণে বেকারি, ফার্নিচার, নির্মাণ ব্যবসা, গৃহায়ণ, কসমেটিক এ- টয়লেট্রিজ, হস্তশিল্প, স্টেশনারি পণ্য শিল্প, ফুল উৎপাদন, খেলনা তৈরি, সিনেমা হল, কাপড় ও জুতার ব্যবসা, ক্রোকারিজ, ফটোগ্রাফি, জুয়েলারি, টেইলরিং, বুটিকস, নার্সারি, বিউটিপার্লার, মোটরগাড়ি বিক্রি, পরিবহন এবং চলাচল, পর্যটন ইত্যাদি সেক্টর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পোষাক শিল্প সহ বড় বড় শিল্প খাত এবং বৈদেশিক রেমিটেন্স খাত প্রণোদনা সহ রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ সুবিধা পেয়ে আসলেও এইখাত ব্যাপকভাবে উপেক্ষিত। অনেকেই মনে করেন ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তির যেসব সুন্দর আলোচনা হয়ে থাকে, তাতে এ অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শ্রেণিটি বেশী উপেক্ষিত  এবং তা সরকারের নীতি সুবিধাতে অনুপস্থিত এমনটি বলা অত্যুক্তি হবে না ।’ একটি ছোট ব্যবসায়ের পিছনে অনেক গল্প থাকে। দীঘ দিনে সঞ্চিত অর্থ, নিকট আত্মীয়স্বজন থেকে ধার করা অর্থ অথবা বিদেশে অবস্থানরত ভাই/বন্ধু কিংবা কোন প্রবাসীর বহুদিনে শ্রম ঘামের বিনিময়ে উপার্জিত অর্থ এই খাতে বিনিয়োগ করা হয়ে থাকে। অনেকে আবার জমিজমা বিক্রি করে অথবা চড়া সুদে ঋণ করে অর্থ লগ্নি করে । বাড়ির বেকার ছেলেটি কিংবা বিদেশ ফেরত লোকটি ভবিষ্যতে সংসার চালানোর তাগিদে নিজে সহ আরো কিছু লোকের কর্মসংস্থানের বন্দোবোস্থ করে। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা পুঁজি । কারন অধিকাংশ পুঁজি আসে হয় ঋণ করে নতুবা সহায় সম্বল বিক্রয় করে। প্রায় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই গড়ে উঠে ভাড়া করা দোকান/ঘর বা স্থাপনায়। ভালো লোকেশনের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে প্রচুর অগ্রীম ও ভাড়া গুনতে হয়। প্রায়শই আয়ের সিংহভাগ চলে যায় ভাড়া পরিশোধে। বাকী যা থাকে তা দিয়ে কর্মচারীর বেতন, ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং পরিবারের ভরণপোষন বাবদ ব্যয় হয়ে থাকে । অনেক ব্যবসায়ী দৈনিক বাকী মালামাল কিনে দৈনিক বেচা-বিক্রীর পর মূল্য পরিশোধ করে যা থাকে তা দিয়ে যাবতীয় খরচাদি মিটিয়ৈ থাকে। অনেক ক্ষেত্রে যথাসময়ে মালামাল বিক্রী করতে না পারলে তা উপর মাল মজুদ করতে গুদাম ভাড়া বাবদ অর্থ ব্যয় করতে হয় । এর ফলে মালের ক্রয় মূল্য বেডে যায়, কিন্ত তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বাজারে একক ভাবে মূল্য কেউ চাইলেও বাড়াতে পারে না। বর্তমানে চলমান লকডাউন, অতিমারীর কারনে এই সকল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক । দোকান বন্ধ থাকার পর ভাড়া, বেতন, ঋণের সুদ ইত্যাদির কারনে এই সেক্টরের অনেক বিনিয়োগকারীরগণ উত্সন্ন । দিশেহারা এই সেক্টরের লোকজনের ক্ষুদ্র পুঁজি দিয়ে কোন ভাবে সংসার চালাতো । দীর্ঘ সময় মহামারী চলমান থাকায় এবং অতীত অভিজ্ঞতার ঘাটতি হেতু অনেক ব্যবসায়ী টিকে থাকার সংগ্রামে হেরে যাচ্ছে।  

শুধু বাংলাদেশ নয়, উন্নত দেশসমূহ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষনায় উঠে এসেছে যে, করোনা মহামারিতে বড়-ছোট সব শিল্পকারখানায় এর প্রভাব পড়লেও তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকারখানা এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুলো বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ওইসিডির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং দ্রুত পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার ক্ষেত্রে দুর্বলতা করোনা মহামারিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে অনেক বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। সক্ষমতা কম তাই করোনার ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লেগেছে এই খাতে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স কর্পোরেশনের (আইএফসি) তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের দুই কোটির বেশি মানুষের কর্মসংস্থান ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের। এই খাতে ৩৭ ভাগ কর্মী করোনা মহামারির কারণে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প নিয়ে করা এক জরিপে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের শতকরা ৯৪ ভাগ প্রতিষ্ঠানে বিক্রি কমেছে। এরপর রয়েছে শ্রীলঙ্কা, সেখানে ৯২ ভাগ প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আফগানিস্তানে ৮৮ ভাগ এবং ভারতে ৮৬ ভাগ এসএমই খাতের প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালে ৮৩ ভাগ এবং পাকিস্তানে সবচেয়ে কম ৬৮ ভাগ এসএমই খাতের প্রতিষ্ঠান করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জরিপে দেশের আট বিভাগের ১২ খাতের প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। খাতগুলো হলো, ফ্যাশন, জামাকাপড়, কৃষি, মৎস্য, খনিজ খাত, পাইকারি বাজার, পরিবহন, খাদ্য, চামড়া, প্লাস্টিক, তথ্য ও ইলেট্রিক পণ্যের বিক্রেতা,যোগাযোগ প্রযুক্তি। তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শতকরা ৯১ ভাগ বলেছে করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে তারা স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি অর্থ সংকটে ভুগেছে। ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায় এই হার যথাক্রমে শতকরা ৬৬ ও ৬৯ ভাগ। 

সংকট উত্তোরনের জন্য শুধুমাত্র ঢালাও ভাবে ঋণ প্রদান করে এই খাতে সংকট মোকাবেলা করা যাবে না। সময়োপযোগী যৌক্তিক কোনো পন্থা অবলম্বন করে ক্ষুদ্র শিল্প খাতকে রক্ষা করার চেষ্টা করা যেতে পারে। এই খাতের সমস্যা গুলো চিহ্নিত করা দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পনা করে ধীরে ধীরে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এখাতের বিনিয়োগকারীরা দক্ষ ও সুসংগঠিত নয়, যার ফলে তাদের সঠিক দাবী দাওয়া সমূহ যথাযথ স্থানে পৌঁছাতে পারে না। এই খাতে সরকারী বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক সময়ে সময়ে হয়রানির বিভিন্ন অভিযোগ করা হয় ব্যবসায়ীদের তরফ থেকে । এই খাতের বিনিয়োকারী ও কর্মচারীরা স্বল্প শিক্ষিত হওয়ায় ভ্যাট নিয়ে তারা প্রায়শই ঝামেলার সম্মুখিন হতে হয়। ব্যাংক ঋণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং জামানত না থাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী/ শিল্পের সাথে জড়িত ব্যক্তিগণ ঋণ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে অধিক দাদনে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে । সংকটময় পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকার প্রদত্ত আর্থিক প্রণোদনা এই বিশাল শ্রমশক্তির তেমন একটা কাজে আসেনি বলে এসএমই ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন। বিআইডিএসের জরিপ অনুসারে  ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য প্রণোদনার টাকা পেতে যেসব শর্ত দেওয়া হয়েছে, তা পূরণ করে টাকা পাওয়া অনেক কঠিন। বিশ্বায়নের এই যুগে ব্যবসা-বাণিজ্যে জগতে প্রতিনিয়ত বহুমাত্রিক পরিবর্তন সংগঠিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের সক্ষমতাকে সময়োপযোগী করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পবান্ধব একটি ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। পরিতাপের বিষয় যে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব, পুঁজির অপ্রতুল যোগান, কঠোর নীতি ও বৈষম্যমূলক আচরণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নকে কঠিন করে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য সরকারি দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রচণ্ড অনীহা ও অবহেলা চোখে পড়ে- যা মোটেও কাম্য হতে পারে না। এই খাতকে সঠিক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘ মেয়াদী রোড় ম্যাপ করে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। নচেৎ দেশে ভয়াবহ সামাজিক বির্পযয় নেমে আসবে । ফলে সামাজিক সুরক্ষা বলয় ভেঙ্গে পড়ার আশংকা রয়েছে।

 অনেকেই বলেন বর্তমান সময়ে ভাবতে হবে সবাইকে । তাই আপনি যখন সকাল বেলা ঘর থেকে পা ফেললেই যে দোকানীর মুখটা দেখে বের হন, আবার ফেরার পথে তাদের সাথে কোন না কোন লেনদেন করে ঘরে ফিরেন তাদের কে টিকিয়ে রাখতে ভাবনার দুয়ার আপনাকেও খুলতে হবে । হ্যাঁ দায়িত্ব বেশী সরকারের । আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি এই সকল ব্যবসায়ীদের আমদানী/রপ্তানীতে সহযোগিতা, ভ্যাট ও আয়কর সুবিধা, নগদ প্রণোদনা, ব্যবসায়িক নতুন নতুন সম্ভবনার ক্ষেত্র সমুহে সহযোগিতা, হয়রানী বন্ধ করা, সরকারী মার্কেট সমুহে কম ভাড়ায় ব্যবসা করা সুযোগ করে দেওয়া, বিভিন্ন পন্যের বিপণনের/বিক্রয়ের জন্য আলাদা আলাদা সেক্টর/স্থান করে দেওয়া, পণ্যপরিবহন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা ইত্যাদি বিশাল এই সেক্টরকে মহামারী মোকাবেলায় সহয়তা করতে পারে। বাংলাদেশর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, আয়বৈষম্য কমিয়ে আনা, দারিদ্র্য বিমোচন প্রভৃতি লক্ষ্য অর্জনে ক্ষুদ্র শিল্প/ক্ষুদ্র ব্যবসা খাতের ওপর গুরুত্ব অত্যধিক। এ লক্ষ্যে পৌঁছাতে সরকারে বিভিন্ন সংস্থা  নিম্নক্তো কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেঃ

১. মাঝারি শিল্পের চেয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে । ২. সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অবশ্যই স্বতন্ত্র ‘ওমেন এন্ট্রাপ্রেনিয়রও ‘ডেডিকেটেড ডেস্ক স্থাপন করতে হবে। এজন্য উপযুক্ত জনবল নিয়োগ দিতে হবে। তাদের এসএমই খাতের অর্থায়নে সহায়ক ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এ ডেস্কে সম্ভব হলে নারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে । ৩. ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর  বিতরণকৃত মোট ঋণের ৪০ শতাংশ এসএমই খাতের জন্য নির্ধারণ করা আছে; কিন্তু বাস্তবে ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হয়। এ খাতকে আরও এগিয়ে নেয়ার জন্য সরকার ঘোষিত নীতিমালার আলোকে এর যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্প/ব্যবসা খাতের উন্নয়নের জন্য কর্মতৎপরতা আরও বেগবান করতে হবে। এতে করে একদিকে যেমন বেকার সমস্যার পরিমান হ্রাস পাবে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিতে আরও গতির সঞ্চার হবে। ৪. প্রযুক্তির শিক্ষা লাভ ও প্রয়োগ করতে হবে। ৫. অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সিএমএসএমই শিল্পখাতে উদ্যোক্তারা ব্যবসা আরম্ভ করেন কোনোরকম অভিজ্ঞতা এবং প্রশিক্ষণ ছাড়াই, তারা পরিচালনার ভিত্তিতে বা অন্যদের দেখে অভিজ্ঞতা লাভ করেন এবং ব্যবসা শুরু করেন, এই ক্ষেত্রে  তাদের প্রশিক্ষণ এর ব্যবসথা থাকা উচিত। ৬. বাংলাদেশের অনেক প্রত্যন্ত এলাকা রয়েছে যেখানে বাণিজ্যিক ব্যাংকের   কোনও শাখা নেই, ঐ সকল স্থানে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে আর্থিক সেবা খুব সহজেই পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। আর ব্যাংকগুলো অতিসহজেই এই উদ্যোক্তাদের কাছে ক্ষুদ্রঋণ তুলে দিতে পারে এবং এমএসএমই উদ্যোক্তাদের সহজে ব্যাংকিং সেবার আওতায় তাদের দৈনন্দিন লেনদেন করার সুযোগ প্রদান করতে পারবে।

৭.ক্ষুদ্র শিল্পের ব্যবহৃত কাঁচামালের সহজলভ্য করা । ৮. একটি ডিজিটাল প্ল্যাটর্ম তৈরি করা।

তবে সরকার বিভিন্ন সময়ে এই খাতের উন্নয়ন এবং টেকসই করার জন্য অনেকগুলো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। দেশের এসএমই খাতের ব্যবসা বিনিয়োগ পরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উন্নতি সাধনের জন্য এসএমই নীতিমালা ২০১৯-এ বর্ণিত রুপকল্প, অভিলক্ষ উদ্দেশ্যর সাথে সংগতি রেখে বেশ কিছু কর্মসূচী গ্রহন করেছে। যেমনঃ প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি, ব্যবসায়ের পরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উন্নতি, উদ্যোগক্তাদের উন্নয়নমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচী গ্রহন, আইসিটিটি ওঅন্যান্য প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও পণ্য ও বোর বাজারে প্রবেশের সহায়তা ইত্যাদি। তবে এইসকল বিষয় বাস্তবায়ন অনেক দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার অংশ বিধায়, সমসায়িক পরিষ্থিতি মোকাবেলায় দ্রুত টেকসই উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে। যাদের ভাড়া স্থাপনা/দোকান/গুদাম এবং কারখানা এসব ক্ষেত্রে স্থাপনার মালিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমজোতার মাধ্যমে যৌত্তিক লেভেল পর্ন্তয ভাড়া মওকুফ/ হ্রাস অথবা কিস্তিতে পরিশোধের ব্যবস্থা করা । ব্যাংক বা অন্য কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান হতে গৃহিত ঋণের সুদ মওকুফ, সরকারী বিভিন্ন ধার্যকৃত চার্জ স্থগিত/মওকুফ এর ব্যবস্থা করা । ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাদের জামানতের সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনা না করে তাদের পারফরম্যান্স বিবেচনা করে ঋণ প্রদানে ব্যাংকগুলোর আন্তরিক হতে হবে। এছাড়া ও দেশীয় বড় বড় শিল্পের মালিকদের তাদের স্টেকহোল্ডার হিসেবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

ক্ষুদ্র/মাঝারী ব্যবসায়ীদের নিজেদের প্রয়োজনে আরো দূরদর্শী হতে হবে। ব্যয় সংকোচন, অতি মুনাফা করার প্রবনতা পরিহার, সুষম প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ গ্রহন, কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি ইত্যাদি কার্যক্রম গ্রহনের ব্যবস্থা নিতে হবে।এই খাতে বিনিয়োগকারীদের যুগের সাথে তাল মিলিয়ে উৎপাদন ব্যবস্থাপনা, বিক্রয় ব্যবস্থাপনা, বিপণন ব্যবস্থাপনা, পারস্পরিক সর্ম্পক উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়ের উপর গরুত্ব দিতে হবে। নীতি নির্ধারকদের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রয়োজন ও সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে সম্ভাব্য করণীয় ঠিক করে আশু ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। এই করোনাকালে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে সঠিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে । তাহলেই হয়তো বড়-ছোট সব ধরণের ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানগুলো এই ক্রান্তিকাল পাড়ি দিতে পারবে। এই খাতের ক্রান্তিকাল মোকাবিলা করা গেলে প্রান্তিক এই ব্যবসায়ীদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে, ভবিষ্যতে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে । তবেই আর্থ-সামাজিক বৈষম্য হ্রাস পাবে । দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এই বিপুল জনগোষ্টিকে অবহেলা করা কিংবা কম গুরুত্ব দেওয়া সময়পযোগী পদক্ষেপ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না।

লেখকঃ আরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া, সরকারী কর্মকর্তা ।

বি.কম(সম্মান),এম.কম(হিসাব বিজ্ঞান), মাস্টার অব ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস (ঢাঃবিঃ),এমবিএ (মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা),উচ্চতর কোর্স (আর্ন্তজাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য) ফেডারেশন ইউনিভার্সিটি অব অষ্টেলিয়া। 

Comments

Popular posts from this blog

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যে নতুন মোড়: ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিলের প্রভাব বিশ্লেষণ ।

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা: ঐতিহ্যের শিকড়ে আধুনিক উত্তরণ ।

ব্রিকস সম্প্রসারণ ও বাংলাদেশের অবস্থান: আমার একটি বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি