আর্ন্তজাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যে নেগোসিয়াশন (Negotiation) গুরুত্বঃ

 লেখকঃ আরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া

নেগোসিয়েশন কিঃ নেগোসিয়েশনের হচ্ছে একটি কৌশলগত আলোচনা যা উভয় পক্ষের নিকট গ্রহণযোগ্য হয় এবং  আলোচনার মাধ্যমে একটি একটি চুক্তিতে উপনিত হওয়া যায়। আলোচনায় মাধ্যমে একটি  পক্ষ  অপর পক্ষকে তার দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত হতে রাজি করানোর চেষ্টা করে।  আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাণ্যিজের ক্ষেত্রে নেগোসিয়েশন অথবা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে উইন-উইন অবস্থা তৈরি করাই হচ্ছে বিরাট সাফল্য। তথ্য উপাত্ত ও যুক্তি দিয়ে বিপক্ষ দলের নিকট হতে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন সুবিধাদি আদায় করে নেওয়া হলো সন্তোষজনক নেগোসিয়েশন। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেগোসিয়েশন এর প্রয়োজন রয়েছে। যাহা যে কোন দেশ,সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে বহুলাংশে সহযোগিতা করে। এর কয়েকটি ধাপ রয়েছেঃ

নেগোসিয়েশনের ধাপ সমূহঃ যেমন; প্রস্তুতি, আলোচনা, লক্ষ্য স্পষ্টকরণ, উইন-উইন আউটকাম, চুক্তি, কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন । নেগোসিয়েশনের জন্য বিষয়টির উপর যথেষ্ট প্রাক প্রস্তুত আবশ্যক । অন্যথায় এটি ফলপ্রসূ হবে না। দ্বীপাক্ষিক/ত্রিপাক্ষিক যে কোন আলোচনায় শারীরীক ভাষা, আই কন্ট্রাক বা চক্ষু যোগাযোগ অতন্ত্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পক্ষ সমূহ যদি পারস্পরিক সামঞ্জস্যপূর্ণ লক্ষ্য নিয়ে টেবিলে আসে, তাহলে আলোচনায় উভয় পক্ষের জন্য ফলপ্রশু ফলাফলের সম্ভাবনা রয়েছে। অবশ্যই, এমন কিছু নেই যা আলোচকদের একটি সুবিধা পেতে এবং অন্য পক্ষকে হারানোর অবস্থানে ঠেলে দেওযার চেষ্টা করতে বাধার সৃষ্টি হবেনা। তবে অতিরিক্ত হারানোর চেষ্টার ক্ষেত্রে ঝুঁকি থাকে যা; অন্য পক্ষ আলোচনা টেবিল থেকে সরে যাওয়ার । প্রত্যেক আলোচনাই value creation করতে হয়। সমস্যার সমাধানের দিকে মনোনিবেশ করা, আত্নবিশ্বাস থাকা, মাইন্ড গেইম  এবং দৃষ্টি ভঙ্গি , পরিস্থিতি বোঝা ইত্যাদি সফল নেগোসিয়েশন অন্যতম উপাদান । উভয় পক্ষের অলোচনা সফল পরিনিতি হলো একটি চুক্তি । সর্বশেষ কর্মপরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন। আর্ন্তজাতিক বাণিজ্যে দেশের অনেক আলোচনাই ব্যর্থ হয় শুধুমাত্র সঠিক প্রস্তুতির অভাব, অপরপক্ষ সম্পর্কে সঠিক ধারনা থাকা, ব্যক্তির কর্মদক্ষতার অভাব, ভাষার অদক্ষতা , ব্যক্তিগত মনোভাব এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে (In the international arena)খ্যাতি ও চিন্তাশৈলীর অভাবের কারনে । আর্ন্তজাতিক নেগোসিয়েশনের ক্ষেত্রে যে সকল বিষয়ের উপর সর্তক থাকতে হয় তা হলোঃ মনে রাখতে হবে, (১) এটি কোন ব্যক্তিগত অর্জনের বিষয় নয়। (২) অপরপক্ষের আলোচনার প্রয়োজনীয়তায় অনাগ্রহ থাকতে পারে। (৩) একজন ব্যক্তির আচরণের কারনে আলোচনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে,

Negotiation ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ঃ ব্যক্তিগত কর্মদক্ষতা, কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা, পজিটিভ চিন্তা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। আলোচনার টেবিলে বিকল্প অনেকগুলো প্রস্তাবনা আপনার থাকতে হবে নতুবা আপনি আলোচনায় হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কখন আলোচনা শুরু হবে, আলোচনা এজেন্ডা কি থাকবে, আলোচনায় কারা উপস্থিত থাকবেন পূর্বেই এ বিষয়ে সম্যক ধারণা নিয়ে অলোচনায় বসলে ভালো ফলাফল আসার সম্ভবনা থাকে। দ্বিপাক্ষিক অথবা ত্রিপাক্ষিক নেগোসিয়েরশনের ক্ষেত্রে আগাম কোন বক্তব্য প্রদান করা উচিত নয়। আলোচনার পূর্বে সু-সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে Negotiation একটি কার্যকর অবস্থায় পৌঁছাতে পারে । যদিও আলোচনার শুরুতে ছোট্ট আলাপ করা সর্বদা সম্ভব হয়না (বিশেষত যদি হাতে সময় কম থাকে কিংবা কঠোর নজরদারী থাকে), গবেষণা দেখা যায় এটি করা সম্ভব হলে প্রকৃত সুবিধা আসতে পারে। এর ফলে উভয় পক্ষ একে অপরের সহযোগী হতে পারে এবং একে অপরকে জানার চেষ্টা করার ফলে মাত্র কয়েক মিনিটেই একটি চুক্তিতে পৌঁছতে সক্ষম হওয়া যায়।

Negotiation কিভাবে কাজ করেঃ যোগাযোগ নেগোয়েশিসনের সবচেয়ে ভালো দক্ষতা হিসেবে বিবেচিত। শারীরিক ভাষা কিংবা মৌখিক ভাষা আর্কষনীয় ভাবে উপস্থাপন করা একটি গুরুত্বপূর্ন কৌশল। স্পষ্ট যোগাযোগ স্থাপন করে, যেকোন ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো যেতে পারে যা আপনাকে চুক্তিতে পৌঁছাতে সাহায্য করতে পারে।

ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স নেগোসিয়েশনের অন্যতম উপাদান । যা হচ্ছে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং অন্যের অনুভূতিকে মূল্যায়ন করার ক্ষমতা। আলোচনার সময় মানসিক গতিশীলতার বিষয়ে সচেতন হওয়া আপনাকে শান্ত থাকতে সাহায্য করবে এবং মূল বিষয়ে মনোনিবেশ করতে উজ্জিবিত করবে। চলমান আলোচনায় কোন রকম অসন্তুষ্টতা থাকলে তাহলে বিরতির প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ একটি উপযুক্ত মাধ্যম যাতে  অন্য পক্ষ সতেজ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনার টেবিলে পরে ফিরে আসতে পারে।  প্রত্যাশিত বিষয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থাপনা একটি অন্যতম শিল্পকৌশল । অন্যের প্রত্যাশা এবং নিজের প্রত্যাশার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা । যাতে আলোচনা ভেঙ্গে না গিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সামঞ্জস্য প্রত্যাশা সৃষ্টি হয় ।

সহনশীলতা, adaptability, পরিকল্পনা, সমস্যা সমাধান করার ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিপক্কতা, আপোষ করার ক্ষমতা, টাইম ম্যান্জেমেন্ট , Analytical thinking ইত্যাদি নেগোসিয়েশনের ক্ষেত্রে দলের/ ব্যক্তির পারঙ্গমতা হিসেবে বিবেচিত হবে । এই সকল গুনাবলী আলোচনাকে একটি উপযুক্ত উপসংহারে উপনিত করবে ।

ভালো আলোচনা (Good negotiations) ব্যবসা সাফল্যের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে । ব্যবসা-বাণিজ্যে কিংবা আর্ন্তজাতিক যেকোন পরিমন্ডলে নেগোসিয়েশন হচ্ছে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ন । ব্যবসা-বাণিজ্যে অযুত সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ‘কান্ট্রি ব্রান্ডিং বাংলাদেশ এর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা-বাণিজ্যে অযুত সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ‘কান্ট্রি ব্রান্ডিং বাংলাদেশ এর ক্ষেত্রে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ন । আমরা যেহেতু ধীরে ধীরে মধ্যম আয়ের দেশের দিকে ধাবিত হচ্ছি সেক্ষেত্রে নিকট ভবিষ্যতে আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে । Negotiation -এর মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কর্তৃক বাংলাদেশকে GSP+ প্রদানের আশ্বাস অবশ্যই আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য ইতিবাচক দিক। LDC graduation -এর ফলে ২০২৭ সালের পর আমাদের সর্ববৃহৎ রপ্তানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে GSP সুবিধা থাকবে না। অন্যান্য দেশের প্রদত্ত GSP সুবিধার বহাল থাকার বিষয়ে বাংলাদেশের সুবিধাপ্রাপ্তির বিষয়টিও নিশ্চিত নয়। LDC graduation হলে বাংলাদেশেকে Rules of Origin প্রতিপালনে কঠোর (Stringent) শর্তাদি প্রতিপালন করতে হবে । LDC graduation হলে আমাদের সর্ববৃহৎ রপ্তানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নের GSP-তে প্রদত্ত বর্তমান শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাতে হবে, যা স্বাভাবিকভাবেই আমাদের রপ্তানি খাতকে প্রভাবিত করবে। LDC graduation -এর পরেও বাংলাদেশের GSP সুবিধা ২০২৭ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে ধরে নিলেও পরবর্তীতে GSP+ সুবিধা গ্রহণের জন্য EU -এর সাথে Negotiation -এর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। শুধুমাত্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে আমাদের বাণিজ্য সুবিধার দৃষ্টি নিবন্ধিত না রেখে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে ASEAN, CIS Countries, Latin America, Middle East প্রভৃতি দেশের সাথে বাণিজ্য সুবিধা আদায়ে Negotiation -এর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে । একুশ শতকের সমস্যাসংকুল বিশ্বায়নে বাণিজ্যনীতি একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বাণিজ্যনির্ভর অর্থ ব্যবস্থায় প্রত্যেকটি দেশই আমদানি রফতানি নির্ভর ব্যবসা পরিচালনা করতে হয় । আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনা ও লেনদেনে বহুপাক্ষিক বা দ্বিপাক্ষিক কোন বিরোধ সৃষ্টি হলে তা আর্ন্তজাতিক বাণিজ্য সংস্থা(WTO)কিংবা উভয় পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হয়। তাই নেগোসিয়েশন রণকৌশল এবং এর সুকৌশল মুক্ত বাণিজ্যে বহুপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে বাণিজ্য পরিচালনায় যথেষ্ট সহজতর মজবুত করে।

Comments

Popular posts from this blog

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যে নতুন মোড়: ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিলের প্রভাব বিশ্লেষণ ।

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা: ঐতিহ্যের শিকড়ে আধুনিক উত্তরণ ।

ব্রিকস সম্প্রসারণ ও বাংলাদেশের অবস্থান: আমার একটি বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি