রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি) নতুন জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ কি না!

 

বিশ্ব বাণিজ্য প্রেক্ষাপট, পর্ব ২

 

রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি) নতুন জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ কি না!

আরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া 



আর্ন্তজাতিকব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীন হচ্ছে মার্কেট লিডার। আর সেই চীনের উদ্যোগে দীর্ঘ আট বৎসরের অক্লান্ত চেষ্টায় এবং বহু দেন-দরবারের বিনিময়ে অবশেষে গঠিত হয়েছে বিশ্বের ১৬টি দেশের সমন্বয়ে রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ র্পাটনারশিপ (আরসিইপি)। চীন যেহেতু ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদনশীলতায় আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী সর্বোচ্চ পর্যায়ে এবং তাদের সাথে ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বীরা অনেক পিছিয়ে তাই চীন সবসময় চাইবে সবাইকে তাদের সাথে প্রতিযোগিতায় নামিয়ে বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হতে। বাংলাদেশসহ যারা উন্নয়নশীল দেশের তকমায় বিভিন্ন ব্যবসায়িক সুবিধাদি ভোগ করে থাকে (যা চীনের জন্য প্রযোজ্য নয়) চীন চাইবে ঐ সকল দেশকে বিভিন্ন ফোরামে নিয়ে এসে গোটা বাজার তার দখল করে নিতে। তখন প্রাপ্য সুবিধাদি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটোসহ অন্যান্য জোটভুক্ত দেশগুলো উঠিয়ে নিবে। যখন প্রচুর বৃষ্টির পর পাহাড় থেকে প্রবল বেগে পানি প্রবাহিত হয় তখন নিন্ম অঞ্চল সমূহ তীব্র স্রোতে সব কিছু ভেসে নিয়ে যায়। তেমনি চীন তাদের বানিজ্যিক সক্ষমতা এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে এখন শুধু বাঁধ খুলতে বাকি।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ট্যারিফ ননট্যারিফ, জিএসপি সহ বিভিন্ন সুবিধা পেয়ে আসছে । যা আমাদের পোষাক রপ্তানীতে বিশেষ অবদান রেখে চলছে। তদপুরি আমাদের পোষাক রপ্তানীর ঊপর
রপ্তানীকারকদের সরকারি নগদ প্রনোদণা প্যাকেজ বিদ্যমান রয়েছে যা - পোষাক রপ্তানীকারকদের ব্যবসা সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। তাছাড়াও বাংলাদেশ বর্তমানে বিভিন্ন আঞ্চলিক, উপ-আঞ্চলিক
জোটের সাথে বাণিজ্য চুক্তি বিদ্যমান রয়েছে। সেক্ষেত্রে যদি বাংলাদেশ আরসিইপি জোটে অংশগ্রহন করতে চায় তা বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তিগুলোর উপর কিরূপ প্রভাব পড়তে পারে
তাও ভেবে দেখার বিষয় রয়েছে। বাংলাদেশ পোষাক রপ্তানীতে বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। প্রথম স্থানটি চায়না নিজ দখলে রেখেছে, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া আমাদের গাঢ়ের উপর
নিশ্বাস ফেলছে। আলোচ্য তিন দেশই চাইবে বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতায় পিছনে ফেলে দিতে। আমরা চায়নার কাছ থেকে ইতোমধ্যে পাঁচ হাজার পন্যের শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা
পেয়েছি। বাংলাদেশের রপ্তানী পণ্যও সেবার বহুমাত্রিক সংখ্যা অত্যান্ত সীমিত। তাই নতুন জোটে অন্তর্ভূক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের পণ্যের
বৈচিত্র্য, বিদ্যান সুযোগ-সুবিধা মার্কেট প্লেয়াদের মনোভাব বুঝতে হবে। এবং বর্তমানে প্রাপ্য সুবিধাদি এবং সম্ভাব্য সুবিধাবলীর পূঙ্খানাপূঙ্ক বিশ্লেষন করা
জরুরী।

গত ২০শে অক্টোবর ২০২০ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক অংশীদারীত্ব এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে যৌথ বিবৃতি প্রদান করা হয়েছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট বিশ্ব-বাণিজ্য কুটনীতিতে সাপে-নেওলে সর্ম্পক, তাই বাংলাদেশকে বুঝেশুনে পা ফেলতে হবে । যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পলিটিক্যাল লিডার। তদপুরি আমেরিকার বাংলাদেশের জন্য জিএসপি সুবিধা আপাততঃ স্থগিত রেখেছে, যা আদায়ের অক্লান্ত প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। এছাড়াও আমেরিকা আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক সহ আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা সমূহের নিয়ন্ত্রক। পদ্মা সেতুতে ঋণ জটিলতায় বাংলাদেশ তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র শীতল বাণিজ্য যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসন কে অনেক বেগ পেতে হয়েছিল। হোয়াইট হাউজে যে আসুক না কেন, আমেরিকার বৈদেশিক নীতি অপরিবর্তিত থাকে ।

 বাংলাদেশের ট্রেড নেগোসিয়েশন দক্ষতায় ঘাটতি, WTO কর্তৃক প্রনীত বিভিন্ন নির্দেশনাবলি পালনে সক্ষমতার অভাব, Ease of Doing Business in Bangladesh বাংলাদেশের অবস্থান, শ্রমিকের কর্ম দক্ষতার অভাব (আমাদের শ্রমিকের প্রোডাকশন রেশিও আন্তর্জাতিক মানের নয়) ইত্যাদি বিবেচনায় বাংলাদেশকে সুদূরপ্রসারী মাষ্টার প্লান করে জোটে প্রবেশের চিন্তাভাবনা করা উচিত হবে।

 যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত এই জোটের বাহিরে হওয়ায় এই দুটি দেশ চাইবেনা রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ পার্টনারশিপ (আরসিইপি) সফল হোক। উল্লেখ্য, রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ হচ্ছে একগুচ্ছ চুক্তি। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিশ্বের ১৬টি দেশ। এই ১৬টি দেশের মধ্যে রয়েছে ১০টি আসিয়ানভুক্ত রাষ্ট্র এবং চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং ভারত।  ভারত এবং ১৫ টি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশের নেতারা সোমবার থাইল্যান্ডে ‘আরসিইপি’ তৈরির ক্ষেত্রে প্রায় আট বছরের আলোচনার কার্যকর সমাপ্তি ঘোষণা করবে, মর্মে ধারনা করা হয়েছিল। কিন্তু ব্যাঙ্ককে তিন দিনের আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনের সময় আরসিইপি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যে বিলম্ব হয়েছে তার নেপথ্যে ভারতের “নতুন দাবি” এবং শুল্ক সম্পর্কিত বিষয় রয়েছে বলে ধারনা করা হয়। ভারত যেহেতু উপ-আঞ্চলিক ডিপ্লোমেটিক প্লেয়ার তারা তাদের স্বার্থকেই বেশী প্রধাণ্য দিবে অনথ্যায় তারা বাহিরে থেকে জোটের সফলতা কামনা করবে তা নয়।

 

চীন তাদের একতরফা বাজার বিস্তৃত করতে বিভিন্ন মহাপরিকল্পনা নিয়ে হাজির হচ্ছে । আমাদের অধিকাংশ অর্থনীতি কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, পোষাক শিল্প, কুটির শিল্প নির্ভর, তাই আমাদের উন্মুক্ত বিশ্ববাজারে প্রবেশ করা অনেক বেশী চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাবে। আমাদের খুটিয়ে খুটিয়ে চলা ছোট ও মাঝারী শিল্প সমূহ বিশ্ব বাণিজ্যের প্রবল দমকা হাওয়ার গতি সামলানোর মত শক্তি সঞ্চয় করতে পারেনি এখনও। বাংলাদেশ যেহেতু আগামী ছয় বছরের মধ্যে এলডিসির তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে, সেহেতু চ্যালেঞ্জটা বাড়তি। কয়েকটি পাক্ষিক সমঝোতায় চুক্তিতে যুক্ত না থাকলে এলডিসির ছাড় ও এলডিসি  উত্তরণ পরবর্তী পর্যায়ে সমন্বয়ে ‍সুবিধা দাবি করার সুযোগ থাকবে কম । আবার এধরনের উদ্যেগে যুক্ত হতে গেলে দরকষাকষিতে যে বাড়তি সক্ষমতা প্রয়োজন, তার যথেষ্ঠ ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। আঞ্চলিক সমঝোতা চুক্তি, ফ্রি ট্রেড জোন সহ অন্যান্য পাক্ষিক বাণিজ্য সমঝোতা গুলোর সঙ্গে সমন্বয় করতে সম্ভাব্য কৌশল ও করনীয় নির্ধারণে অনতিবিলম্বে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপসহ মার্কেট প্লেয়ারদের সঙ্গে অন্যান্য ইস্যুতে পাক্ষিক/দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা চুক্তিগুলোতে যুক্ত হওয়ার পূর্বে আমাদের বিভিন্ন শিল্পগুলোকে টিকিয়ে রাখার পূর্ব প্রস্তুতি থাকা দরকার।

 

বর্তমানে 'বিদেশি আয়' (রেমিট্যান্স) এবং 'তৈরি পোশাক শিল্প' বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। যদিও তৈরি পোশাক শিল্প (রপ্তানি) থেকে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে থাকে, বিদেশ থেকে এর কাঁচামাল ক্রয় বাবদ খরচ থাকার কারণে এককভাবে প্রবাসীদের প্রেরিত বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উৎস। বাংলাদেশ রপ্তানির চেয়ে বেশি পরিমাণে আমদানি করার ফলে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যে ঘাটতি থাকে তা প্রধানতঃ 'রেমিট্যান্স' এর প্রবাহের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়। বাংলাদেশ 'প্রবাসী আয়ের' (রেমিট্যান্স) মাধ্যমেই প্রধানত তাদের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চযয়ন (বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ) বৃদ্ধি হয়ে থকে। ২০১৮ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী বেশি রেমিট্যান্স আয়ের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯ম।[সূত্র প্রথম আলো’২২.০৪.২০২০}। ভারত প্রবাসী আয়ের' (রেমিট্যান্স) ক্ষেত্রে আমাদের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বি। আমাদের জিডিপি প্রধান দুটি খাতের বিপরীতে আমাদের বর্হিবিশ্বে শক্তিশালী প্রতিযোগী রয়েছে বিধায় আমদের সকল পরিকল্পনা খুবই বাস্তবধর্মী ও টেকসই হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ এবং পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন।

CTG journal.com

Dt.17.11.2020

Comments

Popular posts from this blog

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যে নতুন মোড়: ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিলের প্রভাব বিশ্লেষণ ।

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা: ঐতিহ্যের শিকড়ে আধুনিক উত্তরণ ।

ব্রিকস সম্প্রসারণ ও বাংলাদেশের অবস্থান: আমার একটি বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি