প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাসমূহের ভুমিকাঃ
প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বৈদেশিক বিনিয়োগ
এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাসমূহের ভুমিকাঃ
আরিফুল ইসলাম
ভূঁইয়া।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট
করা, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ তৈরি করা ইত্যাদি বিষয়ে সরকারি বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাসমূহ
নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ স্বল্পোন্নত যে কোনো দেশের অর্থনৈতিক
উন্নয়নের জন্য নিয়ন্ত্রক বুনিয়াদি হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমান পরিস্থিতিতে সমগ্র বিশ্বে
বৈদেশিক বিনিয়োগ অবনমন হচ্ছে। ওয়ার্ল্ড
ইনেভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২০-এর তথ্য মতে করোনা পরবর্তী ২০২০ সালে বৈশ্বিক বিনিয়োগ ৪০
শতাংশ কমে গিয়ে ১ দশমিক ৫৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে নেমে আসার
সম্ভবনা রয়েছে। যার প্রভাবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশসমূহে করোনা পরবর্তী বৈদেশিক বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেতে পারে।বাংলাদেশ
বাংকের তথ্য মতে ২০১৯ সালে নীট এফডিআই (এফডিআই হচ্ছে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ) প্রবাহ
ছিল ২৮৭ কোটি ৩৯ লক্ষ ৫০ হাজার ইউএস ডলার,যা আগের বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ কম। ২০১৮ সালে
দেশে এফডিআই প্রবাহ ছিল ৩৬১ কোটি ৩৩ লক্ষ ডলার।অর্থাৎ এক বৎসরের ব্যবধানে এফডিআই কমেছে
৭৩ কোটি ৯৩ লক্ষ ইউএস ডলার । দেশে কর্মসংস্থান সুযোগ বৃদ্ধি, দারিদ্র বিমোচন, বৈদেশিক
রেমিন্ট্যান্স প্রবাহের গতি সমুন্নত রাখা ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি সঁচালন অব্যাহত রাখার
ক্ষেত্রে বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। দেশে বৈদেশিক
বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য দেশের বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাসমুহ নিরলসভাবে কাজ অব্যাহত রেখেছে।বাংলাদেশ
রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা), বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ
(বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ
, রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), পিপিপি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সহ সরকারের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট
মন্ত্রনালয় সমূহ বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ উন্নয়নে কাজ করে থাকে। বিনিয়োগ সহায়তা,আইনী
পরামর্শ, দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ তরান্বিত করার ক্ষেত্রে বিডা হচ্ছে সামনের সারির সংস্থা।
দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারী সেবা প্রদান, নতুন-নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র চিহিৃতকরন, বিনিয়োগ
ব্যবস্থাপনায় নের্তৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে বিডা।
বেপজা দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের তথা বিনিয়োগকারীদের জন্য সুনিদিষ্ট
নিরাপদ অবকাঠামো এবং প্রণোদনা প্যাকেজ সম্বলিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রথম। ১৯৪৭ সাল হতে
১৯৭০ সাল পর্যন্ত দেশে মোট ২২টি শিল্প প্রতিষ্ঠান চালু ছিল। পরবর্তীতে সরকার ও বিভিন্ন
সংস্থার কর্ম উদ্যোগে পর্যায়ক্রমে দেশ দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান
বিকশিত হতে থাকে। বেপজা দেশে নিরাপদ বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি ,কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক
মৃদ্রা অর্জন, জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন, দেশে-বিদেশে বিনিয়োগকারীদের
জন্য একটি নির্ভরতার স্থল এবং শিল্প সহায়ক সূবর্ণ ভূমি বিণির্মানে অগ্রণী ভূমিকা ব্যাপকভাবে
প্রশংসিত। বাংলাদেশ রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) দেশের ইপিজেড সমূহে
বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সুযোগ সৃষ্টি করা,নিরাপদ ও দ্রুত শিল্পায়নের ক্ষেত্রে অগ্রণী
ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন
(সর্বশেষ অক্টেবর’২০২০) অনুযায়ী ইপিজেড সমূহে ৪৬৪ টি শিল্প প্রতিষ্ঠান চালু
রয়েছে (তথ্যঃ বাংলাদেশ ব্যাংক)। এ ছাড়া বাস্তবায়নাধীন আছে আরো ৭৯টি শিল্প-কারখানা।ইপিজেড সমূহে শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহে ৫,৩৭১ মিলিয়ন ইউএস ডলার বিনিয়োগ
হয়েছে এবং দেশী-বিদেশী মিলে সর্বমোট চার লক্ষ চল্লিশ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে
(সুত্রঃবেপজা)। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেশের প্রায় এক কোটি লোক বেপজার উপর নির্ভরশীল
। বেপজা সফলভাবে এ পর্যন্ত ৮টি ইপিজেড বাস্তবায়ন করেছে । দেশের রফতানির আয়ের প্রায়
২০ শতাংশই ইপিজেডের অবদান। উত্তরবঙ্গ
মঙ্গাপীড়িত অঞ্চলে ইপিজেড স্থাপন এবং এর সফলতার কারনে নারীর ক্ষমতায়নের পাশাপশি দ্রারিদ্র
বিমোচনে বেপজার সক্রিয় অবদান ব্যাপকভাবে প্রসংশিত হয়েছে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের
অধিক আগ্রহ থাকার পরও শুধুমাত্র ইপিজেডে জমির (প্লট)স্বল্পতার কারনে বিনিয়োগকারীদের
দেশ থেকে ফিরে যেতে হচ্ছিল।


এমন একটি প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগকারীদের চাহিদা কথা বিবেচনা করে সরকার
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) গঠন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে
অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, লাইসেন্স প্রদান, পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রণ
করার জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত একটি সরকারি সংস্থা।
শুরুতে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের প্রতিশ্রূতি নিয়ে কর্মকান্ড শুরু করে বাংলাদেশ
অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। সরকারে আনুকূল্য এবং ব্যাপক আগ্রহে দেশের বিভিন্ন
অঞ্চলে ঘোষিত হতে থাকে অর্থনৈতিক অঞ্চল। অন্যদিকে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় দেশে আর কোন
ইপিজেড করা হবে না (তথাপি সরকার সম্প্রতি দেশে আরো তিনটি ইপিজেড স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে)।
ইপিজেড সমূহে প্লট স্বল্পতার কারনে নতুন স্থাপিত অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহ (ইজেড) পরিকল্পিতি
শিল্প স্থাপনের জন্য ভুমি উন্নয়ন কাজ পুর্ণ উদ্যোমে অব্যাহত রেখেছে। সরকারি-বেসরকারি
এবং বেপজা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ইজেড সহ এখনো পর্যন্ত ৯৮টি অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদন দেওয়া
হয়েছে (সূত্রঃবেজা)। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে এক কোটি লোকের কর্মসংস্থান
সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে সরকারের পরিকল্পনা অবদান রাখবে
মর্মে আশা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতাধীন বেজা ও বেপজা বৈদেশিক বিনিয়োগ
সংক্রান্ত এবং পরিকল্পিত অঞ্চলে শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য প্রতিষ্ঠিত হলেও দুই প্রতিষ্ঠানের
কাঠামো এবং কাজের প্রকৃতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। অনেকে মনে করেন বেপজা মত সুনামধন্য
প্রতিষ্ঠান থাকার পরও সরকার কেন বেজা গঠন করলো।
বেপজার আওতাধীন রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) কারখানায় উৎপাদিত পণ্য ১০০% বিদেশে
রফতানির জন্য উৎপাদিত হয়। ক্ষেত্র বিশেষে গুরুত্ব বিবেচনায় পূর্ববর্তী বৎসরের মোট রফতানীর
১০% লোকাল এলসির মাধ্যমে শুল্ক পরিশোধ করে দেশী বাজারে বিক্রয় করতে পারে। অপর দিকে
অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানসমূহ স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় বাজারের বিপনণের
জন্য পণ্য উৎপাদিত হবে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত শিল্প কারখানা গুলোকে
একটি পরিকল্পিত অঞ্চলের আওতায় আনার বিষয়ে কাজ করছে বেজা যা বেপজার কার্যক্রমের মধ্যে
পড়েনা। একটি পরিকল্পিত শিল্প অঞ্চল গঠন করা বেজার অন্যতম কাজ। ভিন্ন দুইটি কাঠামোতে
ও আইনে গঠিত হলেও লক্ষ্য ,উদ্দেশ্য প্রায় একই ধরণের হওয়ায় বিনিয়োগকারীগণ বিনিয়োগের
ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কিছুটা দ্বিধান্বিত হতে পারেন। দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগকারীদের
বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে ট্যাক্সেশন,কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স এবং ফরেন এক্সচেঞ্জ রিফর্ম
ইত্যাদি ক্ষেত্রে বেজা সরকারের নীতিনির্ধারনী মহলে উত্থাপন এবং ত্বরিত সমাধানের যথেষ্ট
সুযোগ গ্রহণ করে আসছে। দেশের ইজেড
সমূহে বিদ্যুৎ, আইসিটি, হাইটেক পার্ক, চামড়াজাত শিল্প, কৃষি, টেলিযোগাযোগ, পর্যটন,
জাহাজ নির্মাণ ও প্লাস্টিক শিল্পের জন্য পর্যাপ্ত জমি প্রস্তুতের কাজ চলমান আছে। একই
ইপিজেডে বিদ্যমান আয়তন ও আনুষাঙ্গিক সুবিধা বিবেচনায় এসকল শিল্প প্রতিষ্ঠানের সমূহকে
ইপিজেডে বেশী পরিমানে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করা দরকার।সরকার ঘোষিত ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়নের জন্য দেশের যোগাযোগ, জ্বালানি, সেবা,
প্রযুক্তি খাত থেকে শুরু করে অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল বৈদেশিক বিনিয়োগ দরকার। তুলনামূলক
সস্তা শ্রম, স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি, বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আর সামাজিক সূচক গুলোতে
এগিয়ে চলা বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য। অর্থনৈতিক অঞ্চল
সমূহে বিশেষ বিশেষ অঞ্চল ভাগ করে সকল ধরণের বিনিয়োগের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করার বিপুল
সম্ভবনা বিদ্যমান।
তথাপি বাংলাদেশ রপ্তানী
প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) একটি সরকারে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অত্যান্ত
সফল একটি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এবং বেপজায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অত্যান্ত কম হওয়ায় বিদেশী
বিনিয়োগকারীগণ ইপিজেড সমূহে বিনিয়োগে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে থাকে। যা দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের
কাছে অনেক ক্ষেত্রে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত “বেপজা” ব্রান্ড হিসেবে কাজ করে। এই প্রেক্ষিতে
সরকার অর্থনৈতিক অঞ্চলে বেপজাকে “বেপজা ইজেড” প্রতিষ্ঠা করে বেপজার অর্জিত সুনামকে
কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগকারীদের অর্থনৈতিক অঞ্চলে নিয়ে আসার একটি প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেপজা সরকারের একটি সক্রিয় সংস্থা হিসেবে সাফ্যল্যের সাথে দেশে
বিনিয়োগারীদের বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ সুরক্ষা,বিনিয়োগ বৃদ্ধি,রপ্তানী, কর্মসংস্থানের
সুযোগ সৃষ্টি ইত্যাদি বিষয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সময়ে প্রবাহে আজ বিশ্ব প্রতিযোগিতা
মূলক বাজারে বিনিয়োগের বহুমাত্রিক ক্ষেত্র সৃষ্টি করার প্রয়োজন এবং এর চ্যালেন্জ মোকবিলায়
রাষ্টগুলোকে বহুবিধ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন অবশ্যাম্ভাবী হয়ে গেছে। ফলে বেপজার মত
প্রতিষ্ঠানগুলোকে সফলতার সাথে দীর্ঘ সময় পথ পাড়ি দিলেও প্রয়োজনের পরিক্রমায় সৃষ্ট নতুন
সংস্থাসমূহের সাথে পুরোনো সংস্থা সমূহের প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হওয়াটা স্বাভাবিক। বাংলাদেশ
রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রসারের অগ্রদূত
হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের বিনিয়োগ আর্কষণে নানামুখী কর্মসূচী প্রণয়ন করতে হবে। বিশ্বে অন্যান্য দেশের
তুলনায় বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের অন্যতম সুবিধা হচ্ছে স্বল্প মূল্যের শ্রম। কিন্ত
বর্তমান সময়ে একটি মাত্র উপাদান তথা সস্তা শ্রম দিয়ে কাঙ্ক্ষিত বৈদেশিক বিনিয়োগের যোগান
বাড়ানো সম্ভব নয়। বহুমাত্রিক সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারলে বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের
আকর্ষণের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানো দূঃষ্কর হতে পারে। সে জন্য তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের
সঙ্গে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরিতে সর্বাত্মক প্রয়াস চালাতে হবে। তদসঙ্গে শিল্পকারখানা স্থাপনের
জন্য প্রয়োজনীয় জমি, উন্নত অবকাঠামো, ভোগান্তিমুক্ত যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
দূরীভূত করতে হবে সেবা প্রদানকারী ও সেবা গ্রহণকারীর দুরত্ব । বেপজা'কে সেই সকল
শিল্প প্রতিষ্ঠানের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে, যেসব শিল্প দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার
সম্ভবনা রয়েছে এবং অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে সে সকল শিল্প-প্রতিষ্ঠান
সমূহ কে আলাদা করে দেখ ভালের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সংস্থার সাথে বিনিয়োগকারীদের
নিবিড় সর্ম্পক নিশ্চিত করা উভয়ের জন্য কল্যাণময় হবে। যাতে করে সেবা প্রদানকারী ও সেবাগ্রহণকারী
মাঝে মধ্যসত্বভোগী প্রবেশ করে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুষ্ঠু পরিবেশকে ব্যাহত করতে পারবেনা।
মধ্যসত্বভোগীদের কারণে বিনিয়োগের খরচ বৃদ্ধি পায় এবং সুবিধা ভোগীরা রাষ্ট্রীয় সংস্থাসমূহের
সুনাম ভুলণ্ঠিত করে নিজেদের ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করে। রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ
অঞ্চলে (ইপিজেড) যারা বিনিয়োগ করে তাদের বিনিয়োগ ও ব্যবসা যাতে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত
করতে সহায়তা করা এবং মালিক-শ্রমিক সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ বিরজমান রাখতে হবে। ক্রমবর্ধমান
জনবহুল বাংলাদেশে বিপুল বেকারে জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রতিষ্ঠিত পোশাক শিল্প
খাতকে অতিক্রম করে,উৎপাদন এবং পরিসেবার পরিধি বৃদ্ধি করে নতুন বিনিয়োগ সৃষ্টি করার
জন্য নতুন কাঠামোতে বাংলাদেশ অর্থনেতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা সময়ের প্রয়োজন ছিল। তেমনিভাবে
বিদ্যমান দক্ষ জনবল, প্রযুক্তিগত দক্ষতা,ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা, প্রশিক্ষণের সুবিধা,
নিরাপত্তা কাঠামো, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ইত্যাদি সুবিধাদি কাজে লাগিয়ে বেপজাকে আরো
সুসংগঠিতভাবে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়াতে নিরলস এগিয়ে যেতে হবে।
বিনিয়োগ ও জাতীয় রফতানি
আয়, কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়নে ভুমিকা এই সকল ইপিজেডের অবদান এবং ব্যবস্থাপনাসহ
বিভিন্ন বিষয় দক্ষতাকে বিবেচনায় বেপজার দেশে সকল ধরণের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের
সুবিবেচনার দাবী রাখে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারে গৃহিত কিছু পদক্ষেপ যেমনঃ মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু,
কর্ণফুলী টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি সহ যোগাযোগ অবকাঠামো
উন্নয়নে শত শত কোটি ডলারের মহাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, এই সকল প্রকল্পে জাপান ও চীন
থেকে প্রচুর বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে । দেশের
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দ্রুত গতিশীল করতে বিশেষতঃ শিল্পায়নকে শক্তিশালীকরণ সহ দেশে
বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করেত সরকার উদারনীতি গ্রহণ করেছে। সরকার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার কৌশল হিসেবে দেশব্যাপী
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করছে । এসব অঞ্চলে ইতোমধ্যেই বেশ কিছু জাপান, ইন্ডিয়া,
চীনসহ আরো অনেক দেশ বিনিয়োগ শুরু করেছে। গত কয়েক বছরে বিশ্বে ব্যবসা-বাণিজ্যে গ্রাফ
উর্দ্ধমুখী প্রবাহ ছিল, যার ফলে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের রপ্তানি ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে
রেকর্ড ৪০ দশমিক ৫৩ বিলিয়নে উন্নীত হয়েছে। যেখানে পোশাক খাতই এককভাবে ৮০ শতাংশের বেশি
রপ্তানি করছে।কিন্তু বৈশ্বিক করোনা মহামারির কারনে ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে রপ্তানী আয়
কমে ৩৩.৬৭ এসে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক বিনিয়োগের ব্যতিরেকে
উন্নয়নের কাংঙ্গিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। প্রতিকূলতা পরিস্থিতির মধ্যেও গত চার বছরে বাংলাদেশে এক হাজার ১০০ কোটি ডলারের
বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে (সুত্রঃ কালের কণ্ঠ, তারিখঃ ০১.১২.২০২০)। বাংলাদেশের তথা উন্নয়নশীল
দেশের জন্য এটি অত্যান্ত সুখবরই বটে। দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি এফডিআই আসে ভারতে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্র সর্বাধিক বিনিয়োগ করেছে ভারতে। বর্তমানে
বাংলাদেশের জিডিপিতে বৈদেশিক বিনিয়োগের অবদান প্রায় ১ শতাংশ । বৈদেশিক বিনিয়োগের যোগান
বাড়ানো জন্য নানাবিধ কমর্রপরিকল্পপনা সম্প্রসারিত করার চেষ্টা করতে হবে। অর্থনৈতিক
বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, বাংলাদেশের এফডিআই যদি ৫ থেকে ৬ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হয়,
সেক্ষেত্রে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র-চীন
বাণিজ্য বিরোধ এবং হংকংয়ের ওপর চীনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের কারণে এশিয়ার বাণিজ্যিক
কেন্দ্র হংকং থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাঁদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে শুরু করেছেন মর্মে
বিভিন্ন পত্রিকার খবরে প্রকাশিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে জাপান তাদের বিনিয়োগকারীদের চীন
থেকে বিনিয়োগ সরালে বিনিয়োগারীদের ভর্তুকি দেওয়ার ঘোষনা দিয়েছে। আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা
দিয়ে বিদেশী বিনয়োগকারীদের সুযোগ করে দিতে হবে অর্থনেতিক অঞ্চল, ইপিজেড, হাইটেক পার্কসহ
বিভিন্ন পরিকল্পিত অঞ্চলে। বিনিয়োগে অপার সম্ভবনা থাকার পরও যেহেতু বিভিন্ন ক্ষেত্রে
বিনিযোগের আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সেগেুলোকে উত্তোরনে দ্বার উম্মোচন করে
দিতে হবে বাংলাদেশকে। তবেই আমাদের লক্ষ মাত্রাগুলো অর্জনে আমরা অভূতপূর্ব সাফল্য দেখাতে
সক্ষম হবো। সম্ভবনার কথা হচ্ছে গত ১ ডিসেম্বর
২০২০ তারিখে নারায়নগঞ্জের আড়াইহাজার থানায় জাপান অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়ন কার্যক্রম
শুরু হয়েছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি বক্তব্য আমাদের আশান্বিত
করে,তিনি বলেছেন যে তাঁর দেশ আড়াইহাজার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বড় ধরনের বিনিয়োগ করবে,
এটি হবে এশিয়ার মধ্যে বড় বিনিয়োগ । তিনি আশা করেন দুই দেশের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য
চুক্তি (এফটিএ) বা একটি অগ্রাধিকার বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) করা হলে উভয় দেশেই লাভবান
হতে পারে। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের
(জেট্রো) সম্প্রতি তাদের একটা ষ্টাডিতে এশিয়া এবং ওশানিয়া অঞ্চলে ব্যবসা সম্প্রসারনে
জাপানি বিনিয়োগকারীদের পছন্দের তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষ অবস্থানে আছে। যদিও ইতিপূর্বে
২০১৪ সালে এক প্রতিবেদনে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) বাংলাদেশে বিনিয়োগের
ক্ষেত্রে যে ১৩টি প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করেছিল সেখানে অন্যতম ছিল দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক
জটিলতা। এছাড়া দক্ষ জনশক্তির অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও জমির দুষ্প্রাপ্যতাও ইত্যাদি
বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গন্য করা হয়। সেক্ষেত্রে অর্থনৈতিক
অঞ্চলে জমির প্রাপ্যতা এবং ইপিজেড গুলোতে সুন্দর অবকাঠামো সুষ্ঠু বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ
এবং উভয় স্থানে সহজ প্রশাসনিক কর্মকান্ড বাংলাদেশ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ গুলোকে মোকাবেলা
করতে অনেকাংশে সহায়তা করবে। সমন্বিত নানাবিধ
উদ্যোগসমূহ আমাদের অর্থনীতির ভীতকে আরো সুদৃঢ় কাঠামোতে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করবে। বিনিয়োগ আকর্ষণে নিয়োজিত
পোষাক রপ্তানী সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার আগে থেকেই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য
অর্জনের জন্য যে পরিমাণ বিদেশী বিনিয়োগ প্রয়োজন ছিল সেটির কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রায় বিনিয়োগের
সীমায় পোঁছানো সম্ভব হয় নাই (সূত্রঃ দৈনিক বণিক বার্তা, তারিখঃ ১৫.০৮.২০২০)। অন্যান্য
দেশ কিংবা আমাদের বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্ধিরা কীভাবে এফডিআই আকর্ষণ বিষয়ে কার্যক্রম চালিয়ে
যাচ্ছে তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে রেখে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। বৈদেশিক বিনিয়োগ দৃশ্যমান
অগ্রতি করতে হলে বিনিয়োগ উন্নয়ন সেবা সংস্থাগুলোকে আধুনিক বিশ্বের সাথে সমন্বয় রেখে
সদা কর্মতৎপর থাকতে হবে । নতুবা বিনিয়োগকারীদের অনুসন্ধানী বিচক্ষণ দৃষ্টি নিবন্ধিত
হবে দূর কোথাও অথবা নিকট প্রতিদ্বন্ধির কুঠরে।
Comments
Post a Comment